আবুল খায়ের পাটোয়ারী
সাভারে অটোরিকশা চুরির সন্দেহে গণপিটুনির নির্মম শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক যুবক। নিহতের স্বজনদের দাবি, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। মৃত্যুর আগে তার আকুতি ছিল—দুই দিন ধরে ভাত খাইনি, একটু ভাত এনে দাও। কিন্তু সেই অসহায় আহ্বানও গলাতে পারেনি উপস্থিত মানুষের হৃদয়। অভিযোগ, ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষটিকে চোর সন্দেহে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৩০) চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর দাসাদী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি লোকমান পাটোয়ারীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে সাভার পৌরসভার উলাইল এলাকার একটি অটোরিকশা গ্যারেজে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে হাসপাতাল থেকে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার দুপুরে অটোরিকশাচালক সবুজ ওরফে শুভ এবং গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামানকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে অটোরিকশাচালক সবুজ তার ছোট ছেলেকে রিকশা পাহারায় রেখে বাসায় খাবার খেতে যান। এ সময় আবুল খায়ের শিশুটিকে বলেন, দুই দিন ধরে ভাত খাইনি, ভাত নিয়ে আসো। শিশুটি বিষয়টি বাবাকে জানালে তিনি এসে আবুল খায়েরকে অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকতে দেখেন। এরপর তাকে অটোরিকশা চোর সন্দেহ করা হয়। একপর্যায়ে সেখানে জড়ো হওয়া লোকজন তাকে মারধর শুরু করে।
স্থানীয়দের দাবি, পরে তাকে একটি অটোরিকশা গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে আবারও বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে মরদেহ রেখে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা সেখান থেকে চলে যান।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কামরুন্নাহার জানান, সোমবার দুপুরে দুই ব্যক্তি অটোরিকশায় করে একজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
নিহতের প্রতিবেশী আব্দুল মোতালেব হোসেন বলেন, আবুল খায়ের মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। রোববার ভোরে তিনি চাঁদপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে সাভার থানা থেকে ফোনে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।
আটক গ্যারেজ মালিক নুরুজ্জামান দাবি করেন, তার গ্যারেজে আনার আগেই স্থানীয় লোকজন ওই যুবককে মারধর করেছিলেন। পরে গ্যারেজেও কয়েকজন অটোরিকশাচালক তাকে মারধর করেন। তিনি নিজে মারধরে অংশ নেননি বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, পরে আরেকজনের সহায়তায় তিনি ওই যুবককে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে মৃত ঘোষণা করার পর ভয় পেয়ে চলে আসেন।
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। গণপিটুনির এ ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
একটি সন্দেহ, এক মুহূর্তের উত্তেজনা, আর এক অসহায় মানুষের প্রাণহানি—এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আইনের শাসনের বাইরে গণপিটুনি কখনোই বিচার নয়; বরং তা আরেকটি অপূরণীয় ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।
