যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের করিডোরে এখন যেন এক অদৃশ্য উত্তাপ—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রভাবের দাপট আর অভিযোগের ঝড় মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় অস্থিরতা। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায়ই সামনে এলো বিস্ফোরক এক ঘটনা।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দায়িত্ব নেন নতুন এমডি মো. ইউসুফ হোসেন ভুইয়া। রোববার ছিল তার দ্বিতীয় কর্মদিবস। ঠিক সেই দিনই দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে প্রতিষ্ঠানটির জিএম (এইচআর) মো. মাসুদুল ইসলাম হঠাৎ করে অফিস কক্ষে ডিজিএম (সেলস) মো. হাসান ইমামের ওপর চড়াও হন। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—বাকবিতণ্ডা গড়ায় হাতাহাতিতে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে এমডিকে জানানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই মাসুদুল ইসলামের চাপ ও আচরণে অতিষ্ঠ ছিলেন হাসান ইমাম। এমনকি চলতি মাসের ১৩ তারিখে তিনি পদত্যাগও করেন, যদিও পরে সাবেক এমডি প্রকৌশলী আমির মাসুদের অনুরোধে তা প্রত্যাহার করেন।
একাই পাঁচ পদের ক্ষমতা—এক ব্যক্তির ছায়ায় পুরো প্রতিষ্ঠান-২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল জিএম (এইচআর) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে নিজের চারপাশে শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন মাসুদুল ইসলাম। * বর্তমানে তিনি একসাথে—
* মহাব্যবস্থাপক (এইচআর)
* মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং)
কোম্পানি সচিব
* বিটুমিন সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত
অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক
এমনকি এক সময় ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্বও পালন করেছেন। প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে তার তিনটি পৃথক চেম্বার—যা নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি—সবকিছুই তার একক নিয়ন্ত্রণে। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী “সিন্ডিকেট” যার শিকড় বিস্তৃত বিভিন্ন ডিপো পর্যন্ত।
অভিযোগের পাহাড়—জালিয়াতি, তদবির আর টাকার খেলা। মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ— নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মোটা অঙ্কের লেনদেন
বরখাস্তকৃত সিবিএ নেতাদের রক্ষায় তৎপরতা
গ্রেফতার থাকা অবস্থায়ও ছুটি অনুমোদনের জালিয়াতি
সিন্ডিকেটের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে একটি ঘটনা—দুই সিবিএ নেতা গ্রেফতার থাকার সময়ই তাদের নামে ছুটির আবেদন ও অনুমোদন দেখানো হয়। অভিযোগ, এসব কাগজপত্রে নিজেই স্বাক্ষর করেছেন মাসুদুল ইসলাম।
এছাড়া, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এক সিবিএ নেতার সাসপেনশন প্রত্যাহারের চেষ্টা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তেল চুরি, বদলি আর প্রতিশোধের রাজনীতি
ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় তদন্ত চললেও অভিযোগ রয়েছে—মূল অপরাধীদের আড়াল করতে বদলি করা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। যারা মুখ খুলেছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যত্র। একইভাবে অপারেশন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পুরনো তদন্তেও মিলেছিল অনিয়মের প্রমাণ-২০১৬ সালের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত রিপোর্টে মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন হয়নি—বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে তার প্রভাব।
ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন-চাকরি জীবনে একাধিকবার গাড়ি ঋণ নেওয়া, সেই অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা, চট্টগ্রামে ফ্ল্যাট, প্লট, ডেইরি ফার্ম—সব মিলিয়ে তার বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
নতুন বিস্ফোরক অভিযোগ—‘কারাগারেও ছুটি’ কাগজে জালিয়াতি!
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর একটি—
গ্রেফতার অবস্থায় থাকা সিবিএ নেতাদের নামে ছুটি অনুমোদন!
তদন্তে উঠে এসেছে—
গ্রেফতারের দিন থেকেই ছুটি দেখানো হয়েছে
পুলিশ হেফাজতে থেকেও নাকি আবেদন করা হয়েছে
আর এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছেন স্বয়ং মাসুদুল ইসলাম। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি শুধুই প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি পরিকল্পিত জালিয়াতি?
নীরবতা রহস্য বাড়ায়- এতসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মাসুদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য যে, যমুনা অয়েলের দেয়ালের ভেতরে এখন যেন জমে উঠেছে অজস্র অপ্রকাশিত গল্প—ক্ষমতা, প্রভাব আর প্রতিরোধের এক জটিল নাটক। নতুন এমডির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই অদৃশ্য জাল ছিন্ন করা, নাকি তিনিও হবেন সেই ক্ষমতার নীরব দর্শক—সময়ই দেবে তার উত্তর।
