তেরখাদা পশুর হাট। ফাইল ছবি
খুলনার তেরখাদার ইখড়ি ও ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া—দুই স্থায়ী পশুর হাট ঘিরে এবার যেন নীরব এক ‘দখল রাজনীতি’র গল্প। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে যেখানে লাখো টাকার রাজস্ব ঘরে তোলার কথা প্রশাসনের, সেখানে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের সমঝোতা আর নিয়ন্ত্রণের খেলায় সরকারের আয় নেমেছে তলানিতে।
অথচ হাটের নিয়ন্ত্রণ ও আয়-রোজগার ঠিকই থেকে গেছে একটি প্রভাবশালী বলয়ের হাতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে এই হাট ঘিরে প্রভাব বিস্তার করতেন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই জায়গা এখন দখলে নিয়েছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা। বদলেছে শুধু মুখ, বদলায়নি কৌশল।
এক বছরে ৯৫ লাখ থেকে ৩১ লাখে ইখড়ি হাট!
তেরখাদা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইখড়ি গরুর হাট ২০২৫ সালে ইজারা হয়েছিল ৯৫ লাখ টাকায়। তীব্র প্রতিযোগিতার সেই দর এবার আচমকাই নেমে আসে মাত্র ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ টাকায়। আর আশ্চর্যের বিষয়—গতবারের মতো এবারও ইজারা পান উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিল্টন হোসেন মুন্সী।
সূত্র বলছে, চলতি বছরের ইজারার জন্য প্রথমে ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে পাঁচ দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ‘সমঝোতার কারণে’ প্রথম চার দফায় কেউ অংশ নেননি। শেষ দফায় মিল্টন মুন্সী একাই দরপত্র জমা দেন, যেখানে দর ছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা। পরে সেটি বাতিল হলেও খাস আদায়ের নামে উন্মুক্ত নিলামে আবারও একমাত্র অংশগ্রহণকারী ছিলেন তিনিই। শেষ পর্যন্ত কম দরেই তার হাতে তুলে দেওয়া হয় হাটের দায়িত্ব।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে রাখা হয়েছে, যাতে কম টাকায় হাটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই থাকে।
আমাদের এলাকার হাট, আমরা মিলেই চালাবো”
২০২৫ সালে দরপত্রে অংশ নেওয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রবিউল হোসেন এবার আর অংশ নেননি। কারণ জানতে চাইলে তিনি খোলামেলাভাবে বলেন, আমাদের এলাকার হাট, আমরা মিলেমিশে চালাতে চাই। টেন্ডারে না থাকলেও আমরা একসঙ্গেই আছি।
অন্যদিকে মিল্টন হোসেন মুন্সীর দাবি, হাটের প্রকৃত মূল্য এত বেশি নয়।
তার ভাষায়,
“গতবার ঝামেলা করে অনেক টাকায় ডাক নিতে হইছে, অনেক লস হইছে। এবার সবাই মিলে চালাবো।”
খর্ণিয়া হাটেও একই চিত্র।
ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া হাটেও যেন একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এক নেতা ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকায় হাট ইজারা নিলেও অভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকেই হাটের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
২০২৫ সালে ৭৬ লাখ টাকার বেশি ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে পাঁচ দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও কেউ অংশ নেননি। পরে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। অভিযোগ ওঠে, প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপি নেতারাই পুরো রাজস্ব আদায় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। বছর শেষে সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে মাত্র ২০ লাখ টাকা—যা আগের বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
চলতি বছরও একই পরিস্থিতি। ৬১ লাখ ১২ হাজার টাকা ভিত্তিমূল্যে দরপত্র ডাকা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত আবারও খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাঠে প্রশাসনের চেয়ে সক্রিয় এখন রাজনৈতিক নেতারাই।
প্রশাসনের অসহায়ত্ব
তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা নীলা বলেন,
“কেউ যদি দরপত্রে অংশ না নেয়, আমাদের কী করার আছে? জনবল সংকটের কারণে খাস আদায় করাও কঠিন।”
ডুমুরিয়ার ইউএনও সবিতা সরকারও স্বীকার করেন, ইজারা না হওয়ায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।
রাজস্ব কমছে, নিয়ন্ত্রণ থাকছে একই বলয়ে
স্থানীয়দের মতে, প্রকাশ্যে প্রতিযোগিতা না থাকলেও ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা। ফলে সরকারের আয় কমলেও হাটকেন্দ্রিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতেই।
খুলনার দুই বৃহৎ পশুর হাট এখন শুধু গরু কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতা, প্রভাব আর রাজনৈতিক সমীকরণেরও এক নীরব মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
