কাগজে এক ঠিকাদার, বিল অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে নিম্নমানের পাইলিং, ভূমি অধিগ্রহণে জালিয়াতি ও অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে বিআইডাব্লিউটিএর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। ফাইল ছবি
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের বিস্ফোরক অভিযোগ। প্রায় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এ প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া বিল এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (PD) ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণে থেকে আওয়ামীপন্থী কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের পথ তৈরি করেন।
বাজেট বেড়ে ৩৩৫ কোটি টাকা
প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (DPP) ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা পরে সংশোধন করে দাঁড়ায় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, বাড়তি বরাদ্দের বড় অংশই অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণে প্রকল্প-
অভিযোগ অনুযায়ী, এ প্রকল্পের দুর্নীতির মূল হোতারা হলেন—
প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা
সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার
DG Bangla-এর স্বত্বাধিকারী আরশাদ পারভেজ
Dipn Enterprise-এর স্বত্বাধিকারী সজল চন্দ্র দত্ত
আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় অর্থবিষয়ক সম্পাদক সুভাসসহ একটি প্রভাবশালী চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, আবুল কালাম আজাদ মোল্লার কথিত ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত সজল চন্দ্র দত্তের প্রতিষ্ঠান Dipn Enterprise-কে নিজস্ব ক্ষমতাবলে সাইট ডেভেলপমেন্টসহ একাধিক কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বালু ভরাট ছাড়াই কোটি টাকার বিল
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাইট ডেভেলপমেন্টের কাজে প্রয়োজনীয় বালু ভরাট না করেই ভুয়া বিল তৈরি করে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভবন নির্মাণেও সরকারি অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয়নি এবং অধিকাংশ ভবনের পাইলিং কাজ নিম্নমানের হওয়ায় ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ভূমি অধিগ্রহণেও জালিয়াতির অভিযোগ
সরেজমিনে অনুসন্ধানে স্থানীয়দের অনেকেই অভিযোগ করেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিল বিতরণে নজিরবিহীন জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে।
কাগজে এক ঠিকাদার, বিল গেছে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে
অভিযোগের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো—কাগজপত্রে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে KHANDAKER SHAHIN AHMED LTD & SIGN ENGINEERING LTD (KSL–SEL Joint Venture)-এর নাম থাকলেও বিল প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেছে DG Bangla-এর NRB ব্যাংক, মিরপুর শাখার হিসাবে।
এমনকি Memo No: 18.14.0000.298.19.021.23/279-এর মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার স্বাক্ষরিত পেমেন্ট সার্টিফিকেটও DG Bangla-এর অনুকূলে প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাজ না করেই কোটি টাকার ভাগাভাগি-
অভিযোগ অনুযায়ী—
DG Bangla – ৫৫% : ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫২ টাকা ৯৯ পয়সা
Clients + Consultant – ৪৫% : ২ কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৯ টাকা ৭২ পয়সা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে DG Bangla-এর এক কর্মকর্তা দাবি করেন, চাকরির স্বার্থে তাদের এসব আর্থিক কাগজপত্র তৈরি করতে হয়েছে এবং দুর্নীতির অর্থ কোথায় ও কীভাবে বণ্টন হয়েছে সে সম্পর্কেও তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
Dipu Enterprise-এর ব্যাংক হিসাবেও অর্থ জমার অভিযোগ
সূত্রের দাবি, প্রকল্পের অধিকাংশ দুর্নীতির অর্থ DIPU ENTERPRISE-এর নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাবের তথ্য:
ব্যাংক: Pubali Bank PLC
শাখা: Foreign Exchange Branch
হিসাব নম্বর: 2905901052073
Routing No: 175272321
এছাড়া বড় অঙ্কের লেনদেন নগদ অর্থের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পাইলিং কাজে ভয়াবহ অনিয়ম
অফিস কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রতি ইউনিট পাইলিংয়ের পরিমাপ ছিল— 500 mm Dia, Length: 40.50 মিটার, 16 mm রড: ১০ পিস।
কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে, 300 mm Dia, Length: 23 মিটার, 16 mm রড: ৭ পিস।
অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
‘নিজস্ব ড্রয়িং’ বানিয়ে কাজ
সরেজমিনে জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লা সাইটে TIPE-1 ও TIPE-2 নামে দুটি নিজস্ব ড্রয়িং ব্যবহার করে পাইলিংয়ের কাজ করিয়েছেন, যেখানে সরকারি নকশার পরিবর্তে কম পরিমাপ ও কম রড ব্যবহারের নির্দেশনা ছিল।
বক্তব্য নিতে ব্যর্থ প্রতিবেদক
এ বিষয়ে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেদকের পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি বর্তমান সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর ঠিকাদারি লাইসেন্সের কপি পাঠান এবং দাবি করেন, ওই প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্পের কিছু কাজ সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়েছে।
বিআইডাব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের বিস্ফোরক মন্তব্য
বিআইডাব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ছিল এবং তৎকালীন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার ও ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের প্রভাবের বাইরে গিয়ে কারও কিছু বলার বা করার সুযোগ ছিল না।
এদিকে, প্রকল্পে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক নিরীক্ষা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
