মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চেনা শহরের অচেনা রূপ: ঈদের ছুটিতে ঢাকার বুকে আনন্দের মেলা

রওশন জাহান মিতু
জুন ২, ২০২৬ ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জনসন রোড এলাকা। ছবি- ফোকাস বাংলা

ঈদের দিনের ব্যস্ততা তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও কোরবানির মাংস ভাগাভাগি, কোথাও আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, আবার কোথাও উঠানে বসে চলছে গল্প-আড্ডা। কিন্তু পরদিন সকাল হতেই যেন ঢাকার চিরচেনা রূপ বদলে গেল। বছরের অধিকাংশ সময় যে শহর যানজট আর হর্নের শব্দে মুখর থাকে, সেই নগরী হঠাৎ যেন শান্ত, প্রশান্ত আর নির্মল এক অবকাশযাপনের শহরে পরিণত হলো।

ফাঁকা সড়ক, স্বস্তির বাতাস আর সময়ের কোনো তাড়া না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে নগরবাসী বেরিয়ে পড়লেন চেনা শহরটাকেই নতুন করে আবিষ্কার করতে। ঈদের আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়ল নগরীর উদ্যান, লেকপাড়, ঐতিহাসিক স্থাপনা আর বিনোদনকেন্দ্রের প্রতিটি কোণে।

চিড়িয়াখানায় উৎসবের আমেজ, শিশুদের চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক

জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রবেশমুখেই দেখা গেল মানুষের দীর্ঘ সারি। শিশুদের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা-মায়েরা। কারও চোখে অপেক্ষা, কারও মুখে আনন্দের হাসি। বন্যপ্রাণীগুলোকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।

এবারের ঈদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বহুল আলোচিত অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। হালকা গোলাপি রঙ, মাথার ওপর সোনালি চুলের মতো লোম—দেখতে যেন গল্পের বইয়ের কোনো চরিত্র। এল-০৭ নম্বর খাঁচার সামনে তাই ছোট-বড় সবার ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রয়েছেন।

উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা কায়সার বলেন, “ঈদের ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা থাকায় পরিবার নিয়ে অনেক স্বস্তিতে ঘোরা যায়। জ্যামের চিন্তা নেই, বাচ্চারাও খুব আনন্দ করছে।

সবুজের ছায়ায় বোটানিক্যাল গার্ডেন

চিড়িয়াখানার কোলাহল পেরিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলে যেন অন্য এক জগৎ। চারদিকে সবুজ গাছপালা, ছায়াঘেরা পথ আর পাখির ডাক। কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করছেন, কেউ ঘাসের ওপর বসে ছবি তুলছেন, আবার কেউ প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যে ডুবে যাচ্ছেন। ঈদের আনন্দ সেখানে পেয়েছে শান্তির রঙ।

পড়ন্ত বিকেলে হাতিরঝিলে মানুষের ঢল

বিকেল গড়াতেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে হাতিরঝিল। লেকের পাড় ধরে হাঁটছেন অনেকে, কেউ ওয়াটার বাসে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ আবার সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা উপভোগ করছেন।

সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠতেই হাতিরঝিল যেন রূপ নেয় স্বপ্নময় এক নগরীতে। পানির বুকে আলোর প্রতিফলন, শীতল বাতাস আর মানুষের প্রাণখোলা হাসি মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা তানিয়া বেগম বলেন, “বাসার পাশেই হাতিরঝিল। এখানে এসে বসে থাকতে খুব ভালো লাগে। ঈদের সময় চারপাশে এত মানুষ দেখে মনটা আনন্দে ভরে যায়। তবে পরিবেশটা একটু গুছিয়ে রাখা গেলে আরও ভালো লাগত।

ইতিহাসের পথে ঈদের ভ্রমণ

ঈদের ছুটিতে শুধু বিনোদনকেন্দ্র নয়, দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও।

লালবাগ কেল্লার প্রাচীন দেয়াল, মুঘল আমলের স্মৃতি আর বিস্তৃত চত্বর ঘুরে দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। একইভাবে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলও যেন ফিরে পায় তার পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য।

নাতি-নাতনিদের নিয়ে আহসান মঞ্জিলে ঘুরতে আসা পুরান ঢাকার বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, “ঈদের সময়ই নাতি-নাতনিদের কাছে পাই। তাদের এখানে নিয়ে এসে এই দালানের ইতিহাস বলি। সময়টা খুব ভালো কাটে।

শিশুদের হাসি, তরুণদের আড্ডা

রবীন্দ্র সরোবর, শিশুমেলা, ফ্যান্টাসি কিংডম, নন্দন পার্ক কিংবা বসুন্ধরা সিটির টগি ফান ওয়ার্ল্ড—সবখানেই ছিল শিশুদের উৎসব। রাইডে চড়ার উচ্ছ্বাস, হাসি আর কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে বিনোদনকেন্দ্রগুলো।

অন্যদিকে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ফিরে পায় রাজধানীর থিমেটিক ও নান্দনিক রেস্তোরাঁগুলো। বন্ধুদের আড্ডা, পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজ কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।

দিনভর ঘোরাঘুরির পর কেউ নিজস্ব গাড়িতে, কেউ রিকশায় চড়ে উপভোগ করেন ফাঁকা ঢাকার রাতের সৌন্দর্য। ব্যস্ত নগরজীবনের ফাঁকে পরিবারকে সময় দেওয়ার এই সুযোগই যেন ঢাকাবাসীর কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় উপহার।

ঈদের ছুটিতে তাই ঢাকাকে মনে হয়েছে যেন এক বিশাল গ্রামীণ মেলার মতো—যেখানে নেই কর্মব্যস্ততার চাপ, আছে শুধু মানুষের মিলন, আনন্দ, স্মৃতি আর আপনজনের সঙ্গে কাটানো অমূল্য সময়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।