যানজটে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর সড়কগুলো। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকা আজ যেন ভালোবাসাহীন এক ক্লান্ত প্রেমিকার মতো—অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস, ধুলো-ধোঁয়ায় ঝাপসা চোখ, আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা প্রতিটি রাস্তা। ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি দুর্ঘটনা তেজগাঁওয়ের বুক চিরে এমন এক যানজটের জন্ম দিল, যেখানে সময় থমকে দাঁড়াল, আর মানুষ হারাল স্বস্তির শেষ আশ্রয়টুকুও।
সকাল ৮টায় রেইনবো ক্রসিং—যেখানে প্রতিদিনের ব্যস্ততা গড়িয়ে চলে—সেখানেই শুরু হয় বিশৃঙ্খলার প্রথম অধ্যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থীবাহী বিআরটিসির দোতলা বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বিশাল এক বাধা হয়ে। যেন হঠাৎ করেই শহরের স্পন্দন থেমে যায়। রেকারের ধীর গতির টানে ৫০ মিনিট ধরে আটকে থাকে মানুষের গন্তব্য, আটকে থাকে অগণিত গল্প, অপেক্ষা আর ভালোবাসা।
এরপরও যেন শহরকে ছাড়েনি দুর্ভাগ্য। ঘণ্টাখানেক না যেতেই একই স্থানে আরেকটি মাইক্রোবাসের নিয়ন্ত্রণ হারানো—যেন একই ক্ষত বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে। ক্রেন এসে সরালেও, জটের শেকড় ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে—তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, মহাখালী, ফার্মগেট—সবখানেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
সন্ধ্যা নামার আগেই আরেকটি আঘাত—লাভরোড ফ্লাইওভারে বিকল হয়ে পড়ে আজমেরি পরিবহনের বাস। শহরের গতি তখন একেবারেই স্তব্ধ। যেন ক্লান্ত এক প্রেমিক, আর চলতে পারছে না।
তবে শুধু দুর্ঘটনাই নয়, এই দহনজটের আরেক নির্মম রূপ ছিল ফিলিং স্টেশনগুলো ঘিরে। জ্বালানির অপেক্ষায় গাড়ির লম্বা সারি রাস্তার বুক দখল করে নিয়েছে। কোথাও বোঝার উপায় নেই—কোথায় রাস্তা, কোথায় অপেক্ষার লাইন। এই বিশৃঙ্খলায় শহরের প্রতিটি মোড় যেন হয়ে উঠেছে একেকটি আটকে পড়া অনুভূতির কোলাহল।
পহেলা বৈশাখের রঙিন আবেশ কাটতেই প্রথম কর্মদিবসে এমন ক্লান্তি—যেন উৎসবের পর প্রেম ভেঙে যাওয়ার নিঃশব্দ বেদনা। ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লেগেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ হেঁটে গেছে, কেউ থেমে থেকেছে, কেউ হয়তো হারিয়েছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—একটি দেখা, একটি কথা, কিংবা একটি ভালোবাসা।
নগরবাসীর অভিযোগে মিশে আছে হতাশার দীর্ঘশ্বাস—ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলার অভাব, ফিলিং স্টেশন ঘিরে বিশৃঙ্খলা, আর কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা। এই শহর, যে শহর প্রতিদিন স্বপ্ন বুনে, আজ যেন নিজেই নিজের জালে বন্দি।
ঢাকা আজ শুধু একটি শহর নয়—এ যেন এক অবরুদ্ধ হৃদয়, যেখানে ভালোবাসা আটকে গেছে যানজটের লাল সিগনালে…।
