মঙ্গলবার, ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুর্নীতির শাস্তি বাতিলের পরই ২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্বে জুয়েল

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ ১১:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পদাবনতি ও চার বছরের পদোন্নতি স্থগিতের শাস্তি, একের পর এক শোকজ; রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ওয়াসার বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার অভিযোগ। ফাইল ছবি

প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলের চাকরিজীবন যেন বিতর্ক আর অভিযোগের দীর্ঘ অধ্যায়। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পর শাস্তি হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয়েছিল তার। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগে চার বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত না হওয়া, সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা অভিযোগে তাকে দেওয়া হয়েছে একাধিক কারণ দর্শানোর নোটিশ। এমনকি তার কথিত তদবির-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে দলীয় নেতারাও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

আলোচিত এই প্রকৌশলী বিএনপি সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। চাকরিজীবনের শুরু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। পরে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হন। দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তি হিসেবে পদাবনতি হয়ে আবার সহকারী প্রকৌশলী হন। এরপর অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে উপ-প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এর মধ্যেই খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ নিয়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা। গত ২৮ জুন খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগ দেওয়ার পর প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ। সর্বশেষ ২ সেপ্টেম্বর ওই প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পান আরিফুল ইসলাম জুয়েল।

জটিল প্রকল্পে অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী বলেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত জটিল প্রকৌশলগত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ধরনের প্রকল্প পরিচালনায় জুয়েলের সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নেই। ফলে কোন যোগ্যতা বা ক্ষমতাবলে তাকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে।

খুবির ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর হাঁটাচলার সময় ভবনটিতে কম্পন অনুভূত হতে থাকে। নতুন ভবনে এমন কম্পনের কারণ অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত ওই কমিটি ছাদের চারটি স্থানের স্ল্যাব কেটে পরীক্ষা করে বড় ধরনের অনিয়ম দেখতে পায়।

নমুনা পরীক্ষায় দেখা যায়, ভবনের ছাদে নকশা অনুযায়ী কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা ছিল মাত্র ৩ ইঞ্চি, আবার কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি। এতে স্থাপনার নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা অনিয়মে বাধা না দিয়ে উল্টো ঠিকাদারের পক্ষে বিল ছাড়ের সুপারিশ করেছিলেন। কাজ শেষে ছাদে সাড়ে ৫ ইঞ্চি কংক্রিট রয়েছে উল্লেখ করে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয় বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়।

দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয় এবং চার বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছিল।

শাস্তি বাতিল, এরপরই পদোন্নতি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও অ্যাবের সদস্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জুয়েলের আগের শাস্তি বাতিল করানো হয়। পরে ২০২৫ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর প্রথম ঘটনাও ঘটে তাকে ঘিরে।

বদলি-পদায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে খবরদারি শুরু করেন জুয়েল। বিভিন্ন দপ্তরে বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপ এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তদবির করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এমন অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৫ সালের ২৬ জুন অ্যাব সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, সাত থেকে আট মাস ধরে জুয়েলের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসছে। দলের পদ ব্যবহার করে তিনি কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ করা হয়। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তদবির করার অভিযোগও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে উল্লেখ করে অ্যাবের খুলনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে জুয়েলকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।

‘সব অভিযোগ ভুয়া’, দাবি জুয়েলের

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরিফুল ইসলাম জুয়েল।

মুঠোফোনে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগই ভুয়া। একজন ব্যক্তি তার পেছনে লেগেছেন। তার কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে সব কাগজপত্র রয়েছে।

বিএনপি তাকে চিঠি দিয়েছে—এমন প্রচারণাও মিথ্যা দাবি করে জুয়েল বলেন, নগর বিএনপির সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা একাধিকবার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ফ্যাসিবাদ আমলে তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই সময় তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তার আগের শাস্তি বাতিল করা হয়েছে।

বড় প্রকল্পের পিডি হওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই দাবি করে জুয়েল বলেন, যোগ্যতা থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই যোগ্যতার কারণেই মন্ত্রণালয় তাকে প্রকল্প পরিচালক করেছে।

কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন

জুয়েলের আগের কর্মস্থল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, দেরিতে অফিসে আসা ও নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন—তিন মেয়াদেই একাধিকবার তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে ৫৪ দিনই তিনি দেরিতে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন তিনি।

এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ তাকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পরও তিনি নিয়মিত কার্যালয়ে যান না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্ষেত্রে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকায় এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে ‘তৎপরতা’র অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাকে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে জুয়েলই তাকে সরিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ২৮ জুন ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর প্রকল্পটির পরিচালক হওয়ার জন্য জুয়েল নানা তৎপরতা চালান বলে অভিযোগ। তবে ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে।

এরপর ফিরোজ শাহকে দায়িত্ব থেকে সরাতে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবির করার অভিযোগ ওঠে জুয়েলের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির দায়িত্ব পান জুয়েল।

‘রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশ্রয় দিলে ওয়াসা আরও নাজুক হবে’

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সুপেয় পানি সরবরাহে ব্যর্থতা, বিল নিয়ে ভোগান্তি এবং সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা কারণে খুলনা ওয়াসা একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে সচল করতে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।

এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।