নদীবন্দর শাখার সাবেক কর্মকর্তা এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। ফাইল ছবি
নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ, আন্দোলনে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অর্থের জোগান, ভুয়া টেন্ডার বাণিজ্য, বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নদীবন্দর শাখার সাবেক পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ এবং বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগসংবলিত ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও বরখাস্তের মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে আবারও অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন শাখায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের কাছে তিনি ‘পল্টিবাজ আরিফ’ নামে পরিচিত বলেও দাবি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নাম আরিফ হাসনাত হিসেবেও ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।
তার বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার রায়পুর গ্রামে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এলাকার বাসিন্দা হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে বিআইডব্লিউটিএতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
সংবাদ প্রকাশের পরও পদোন্নতির প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এমনকি সংবাদ প্রকাশের পরও তিনি যুগ্ম পরিচালক থেকে পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক হন।
এ অবস্থায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও কীভাবে তার পদোন্নতি হয়?
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ব্যবস্থা না নেওয়ার সুযোগেই সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রবণতা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্মকর্তাদের একটি অংশ রাতারাতি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরিফ উদ্দিন নিজেকে বর্তমানে বিএনপির ‘সাচ্চা কর্মী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে তার অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যায়।
বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছবি
আরিফ উদ্দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন পোস্ট ও ছবিকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। একটি পোস্টে ১৭ মার্চ ২০২২ তারিখে জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানানোর কথা উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি আওয়ামীপন্থী হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেন। এ কারণেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তাকে ‘পল্টিবাজ আরিফ’ নামে অভিহিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আরিফ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের বিভিন্ন ছবি তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে তুরাগ নদীতে নৌকা বাইচ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি নিজের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপব্যবহার করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার ও কর্মকর্তার কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব আর্থিক অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নদী উচ্ছেদকে ঘিরে কোটি টাকার অভিযোগ
আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও তুরাগ নদী এলাকায় অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—নদীর সীমানা পিলার স্থাপন ও স্থানান্তর, নিলাম কার্যক্রমে অনিয়ম, মালিকানাধীন জমিকে সরকারি জমি দেখিয়ে অন্যত্র লিজ দেওয়া, বন বিভাগের জমি বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ঘুষ গ্রহণ, বৈধ ভবন উচ্ছেদ এবং প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণের অভিযোগ।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের পাগলায় চায়না কোম্পানির দুটি জাহাজ নিলাম, গাবতলীতে ১৭টি ট্রাক নিলাম এবং বিভিন্ন উচ্ছেদ কার্যক্রম ঘিরেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে একাধিক মামলার অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে নমনীয় থাকলেও সাধারণ মানুষ ও বৈধ স্থাপনার মালিকদের উচ্ছেদে কঠোর অবস্থান নেওয়া হতো।
অভিযোগ রয়েছে, চার কোটি টাকার বিনিময়ে মদনগঞ্জ ট্রলার ঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ে মাহফুজুল ইসলামের আলিনা ডকইয়ার্ড ও শাকিলদের মুন্সি ডকইয়ার্ড উচ্ছেদ করে অন্য একটি ডকইয়ার্ডকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় মাহফুজুল ইসলাম উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সমঝোতার ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার তৎকালীন ওসি আবুল কালাম মধ্যস্থতা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
ডিইপিটিসির গাছ কাটার অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ ডেক ইঞ্জিন পার্সোনেল ট্রেনিং সেন্টারের (ডিইপিটিসি) জমি ও গাছ কাটার অভিযোগও রয়েছে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বহু গাছ কেটে একটি ডকইয়ার্ড মালিককে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
কাঁচপুরে নদীর তীরে বালু ভরাটে সহায়তার অভিযোগে তাকে বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান কমডোর এম. মোজাম্মেল হক শোকজ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
মদনগঞ্জ, কাঁচপুর, ঢাকেশ্বরী ও রূপগঞ্জ এলাকায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মানববন্ধনও হয়েছে বলে জানা যায়। ডকইয়ার্ড মালিক মাছুম, আবুল কালাম বসু, মাহফুজুল ইসলাম ও শাকিলসহ একাধিক ব্যক্তি তার কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
ইসলামবাগে ১৮ ভবন উচ্ছেদের অভিযোগ
ঢাকা নদীবন্দরের কর্মকর্তা থাকাকালীন লালবাগের পূর্ব ইসলামবাগ এলাকায় প্রায় ১৮টি বৈধ ভবন উচ্ছেদের অভিযোগও রয়েছে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ভবন ভাঙার আগে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। ভবনে বসবাসরতদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা না দেওয়ার কারণে কয়েকটি বৈধ ভবন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও আদালতের সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
সদরঘাটে মসজিদ ভাঙাকে ঘিরে সংঘর্ষ
২০১৮ সালের ৫ আগস্ট সদরঘাটে বায়তুল নাজাত মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাতেও আরিফ উদ্দিনের নাম উঠে আসে।
ঘটনায় পাঁচজন আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। মসজিদের দুটি দোকান ও মাসিক ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নির্দেশে মসজিদটি সংস্কার করে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিকনিকের লঞ্চে উত্তেজনা
সদরঘাট থেকে একটি সংগঠনের দুটি লঞ্চ চাঁদপুরের উদ্দেশে পিকনিকে যাওয়ার আগে পোর্ট অফিসার হিসেবে আরিফ উদ্দিন লঞ্চে অভিযান চালান বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে আর্মি অফিসার, সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লঞ্চের মাস্টারকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে যাত্রীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হলে লঞ্চের ঝাড়ু দিয়ে পোর্ট অফিসারকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের অনুসন্ধানে আরিফ উদ্দিন
আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম (অনু ও তদন্ত-২)-এর টিমের পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (প্রশাসন) বরাবর চিঠি দিয়ে এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাতের বিরুদ্ধে নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছিল।
দুদকের চাহিদা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ পোর্টে ১ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত এবং সদরঘাট পোর্টে ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণী চাওয়া হয়।
এছাড়া তার ব্যক্তিগত নথি, চাকরির শুরু থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বেতন-ভাতার বিবরণ, দায়িত্বসংক্রান্ত অফিস আদেশ এবং স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার পরিচালনার আবেদন ও অনুমোদনসংক্রান্ত রেকর্ডপত্রও চাওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিপুল সম্পদের অভিযোগে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার।আরিফ উদ্দিন ও তার পরিবারের নামে রাজধানী ঢাকা এবং পাবনার সুজানগরে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার ৩০১ এলিফ্যান্ট রোডে তার স্ত্রী শামীমার নামে একটি বাড়ি রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার পরিবারের নামে ফ্ল্যাট এবং ভাড়ার জন্য আরও একটি ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে। পূর্বাচলে প্লট এবং বসুন্ধরায় অংশীদারিত্বে একটি ভবন নির্মাণাধীন থাকার অভিযোগও রয়েছে।
তার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে এবং মেয়ে লন্ডনে পড়াশোনা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস ও বৈধতা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বরখাস্তের পরও ৩০ দিনের মধ্যে পদায়নে প্রশাসনে হতাশা। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে তার সাময়িক বরখাস্ত এবং পরবর্তী পদায়নকে ঘিরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগসংবলিত ভিডিও ক্লিপ প্রকাশের পর সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর বিধি ৩৫ (খ) ও (ঙ) লঙ্ঘনের অভিযোগে বিধি ৪১(১) অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এর মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে, ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনকে ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগ, ঢাকায় বদলি করে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—যে অভিযোগে একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো, সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি বা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কীভাবে তাকে আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলো?
‘২০ কোটি টাকার বিনিময়ে পদায়ন’—অভিযোগ, প্রমাণ মেলেনি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নদীবন্দর শাখার একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনকে অন্য বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।
তবে কার মাধ্যমে, কবে এবং কীভাবে কথিত এই অর্থের লেনদেন হয়েছে—এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা স্বাধীন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বরখাস্ত ও পরবর্তী পদায়ন সম্পর্কে জানতে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (প্রশাসন) মো. শাহেদ রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া যায় এবং তাকে তিরস্কার দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
অন্যদিকে বিদেশে অর্থ পাচার, কথিত ভুয়া বিল-ভাউচার, দুর্নীতি, দুদকের অভিযোগ এবং পুনরায় পদায়নের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের বর্তমান পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এখন মূল প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, নারী কেলেঙ্কারি, অসদাচরণ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পর তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা কী ছিল এবং বরখাস্তের মাত্র এক মাসের মধ্যে তার পুনঃপদায়নের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো?
অভিযোগগুলোর সত্যতা, কথিত সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং পদায়নের পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তই পারে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনতে।
