দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই শুরু নতুন নিয়োগ কার্যক্রম; ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংকটে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা। ফাইল ছবি
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চলমান নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাসের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি কার্যত স্থগিত করায় প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে অসন্তোষ, উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহাপরিচালক জায়েদ কামালের নির্দেশনায় গৃহীত এ সিদ্ধান্তকে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কঠোর, অমানবিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন।
গত ২ জুন মহাপরিচালকের পক্ষে জারি করা এক নির্দেশনায় জানানো হয়, ১১ জুন থেকে ১৩ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য শারীরিক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষাকে সামনে রেখে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছুটি দেওয়া যাবে না। বিশেষ প্রয়োজনে ছুটি মঞ্জুর করতে হলেও অধিদপ্তরের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ছুটি কেবল প্রশাসনিক সুবিধা নয়; এটি কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষার একটি মৌলিক অধিকার। সাধারণত যুদ্ধাবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা সংকট কিংবা জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ছুটি বাতিল বা সীমিত করা হয়। অতীতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সময় এমন নজির রয়েছে।
কিন্তু একটি নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য ছুটি সীমিত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অধিদপ্তরের বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে অনুষ্ঠিত আগের নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েই যখন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখনো আলোচনায় রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাপরিচালক জায়েদ কামালের দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিচালিত প্রথম নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। চাকরিপ্রত্যাশীদের একাংশ নিয়োগ বঞ্চনার অভিযোগ এনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন গণমাধ্যম এবং টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশিত হলেও অভিযোগকারীদের দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় সমালোচকদের প্রশ্ন, পূর্ববর্তী নিয়োগ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন না করেই কেন আবার নতুন নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হলো? নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি সীমিত করার সিদ্ধান্ত কি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে না?
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক জটিলতা এবং ব্যক্তিগত জরুরি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নতুন নির্দেশনার কারণে তারা ছুটি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাদের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজন প্রমাণ এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবে ছুটি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকের মধ্যে মানসিক চাপ, হতাশা এবং কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ বাড়ছে।
মহাপরিচালকের নির্দেশনায় নিয়োগ কার্যক্রমে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, অনুমতি ছাড়া নিয়োগস্থলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অধিকতর স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও বিতর্কমুক্ত রাখা।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পূর্ববর্তী নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ। অন্যথায় নতুন নিয়োগ কার্যক্রমও আস্থার সংকট ও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জায়েদ কামাল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
