প্রতীকী ছবি
রাজধানীর পল্লবীর এক নিঃশব্দ ফ্ল্যাটে যেন জমে উঠেছিল অদৃশ্য এক ট্র্যাজেডির মঞ্চ—সেখানে নির্মমতার শেষ অধ্যায়ে প্রাণ হারালেন শিক্ষিকা ফিরোজা খানম জোসনা (৬৮)। হাতুড়ির আঘাতে থেঁতলে দেওয়া হলো তার স্বপ্ন, তার একাকী জীবনের দীর্ঘ গল্প থেমে গেল রক্তাক্ত এক প্রভাতে।
শুক্রবার পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর মর্গে পাঠায়। লাশের পাশেই পড়ে ছিল রক্তমাখা একটি হাতুড়ি—নৃশংসতার নির্বাক সাক্ষী হয়ে।
পুলিশ জানায়, পল্লবী থানার ডি ব্লকের আট নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের একটি ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একাই বসবাস করতেন ফিরোজা। জীবনের শুরুতে বিয়ে হলেও তা টেকেনি; এরপর থেকে একাকীত্বই হয়ে ওঠে তার সঙ্গী। পরিবার থেকেও ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তবে শিক্ষকতা আর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাই ছিল তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের একটিতে থাকতেন তিনি। পাশের কক্ষে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন রাজু মুন্সি, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। আরেকটি কক্ষ ছিল খালি—গেটে ঝুলছিল ‘টু-লেট’ সাইন, যেন এক নিঃসঙ্গ জীবনের নিঃশব্দ ঘোষণা।
প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাত ১০টার দিকে ফেরেন ফিরোজা। কিন্তু পরদিন সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তার কোনো সাড়া না পেয়ে উদ্বিগ্ন হন ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল মান্নান। খোঁজ নিতে গিয়ে দরজা খোলা দেখতে পান তিনি। পরে স্থানীয় মহিউদ্দিনকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিভীষিকাময় দৃশ্য—রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন ফিরোজা।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ। পরে বাংলাদেশ পুলিশ সিআইডি-এর ক্রাইমসিন ইউনিট এসে আলামত সংগ্রহ করে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক সরকার জানান, লাশের পাশে একটি হাতুড়ি ও একটি ওড়না পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আঘাতে তার মাথা থেঁতলে গেছে।
একটি নিঃশব্দ ফ্ল্যাট, একাকী এক জীবন—আর তার করুণ পরিণতি যেন শহরের বুকেই লিখে দিল এক শীতল বার্তা: কখনও কখনও সবচেয়ে নির্জন ঘরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার।
