শুক্রবার, ৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পশুর হাটে ‘সিন্ডিকেট রাজ’ বিএনপি নেতাদের প্রভাব, দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ৮, ২০২৬ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পশুর হাট ইজারা ঘিরে এবার উঠে এসেছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট, নিয়ন্ত্রিত দরপত্র ও রাজস্ব কমে যাওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ। ছয় জেলার আটটি বড় পশুর হাট পর্যালোচনায় দেখা গেছে—ছয়টি হাটে সরকার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা কম রাজস্ব পেয়েছে। বিপরীতে মাত্র দুটি হাটে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রভাব, সমঝোতা ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি। কোথাও কোথাও বহু শিডিউল বিক্রি হলেও শেষ পর্যন্ত জমা পড়েছে মাত্র একটি দরপত্র। ফলে প্রতিযোগিতা না থাকায় কম দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে কোটি টাকার হাট।

যেসব হাটে কমেছে কোটি টাকার রাজস্ব

রাজস্ব কমেছে চট্টগ্রামের সাগরিকা, রাজশাহী সিটি হাট ও বানেশ্বর, গাজীপুরের টঙ্গী পশুর হাট, খুলনার তেরখাদার ইখড়ি এবং মানিকগঞ্জের আরিচা পশুর হাটে।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনাইচণ্ডী ও তক্তিপুর হাটে কিছুটা রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, “প্রতিযোগিতা কম” হওয়াই কম রাজস্বের কারণ। তবে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের দাবি—নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও দরপত্র সিন্ডিকেট।

চট্টগ্রামের সাগরিকা হাটে কোটি টাকার ধস

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সাগরিকা পশুর হাট এবার ইজারা হয়েছে ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪ সালে এ হাট ইজারা হয়েছিল ৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়।
২০২৫ সালে প্রত্যাশিত দর না পাওয়ায় কোনো ইজারাই দেওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, রাজনৈতিক চাপ থাকলেও তিনি সেটিকে প্রশ্রয় দেননি। তাঁর ভাষায়, এবার স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি স্বচ্ছতা থাকে, তাহলে কেন আগের তুলনায় কমলো রাজস্ব?
এদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রামে এবার ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সিটি করপোরেশন, যা গতবার ছিল ১০টি।

রাজশাহীতে ‘সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি’ ব্যবসায়ীরা

উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় পশুর হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহী সিটি হাট এবার ইজারা হয়েছে মাত্র ৮ কোটি টাকায়। অথচ গত বছর এর ইজারা মূল্য ছিল ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক হাটেই কমেছে প্রায় ৬ কোটি টাকা রাজস্ব।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে। অনেকে শিডিউল কিনলেও শেষ পর্যন্ত জমা দিতে পারেননি।
কারও কাছ থেকে “শেয়ারের” প্রতিশ্রুতিতে শিডিউল নিয়ে পরে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে জেলার বৃহত্তম বানেশ্বর হাটেও কমেছে ইজারা মূল্য। গত বছর ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকায় পাওয়া হাটটি এবার ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকায়। সেখানে মাত্র দুজন শিডিউল কিনেছিলেন, কিন্তু একজন সমঝোতা করে সরে দাঁড়ান।

গাজীপুরে ১৮ শিডিউল, জমা মাত্র ১টি

গাজীপুরের বৃহত্তম অস্থায়ী টঙ্গী পশুর হাটে এবার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে।
১৮টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র একটি দরপত্র। সেই একমাত্র বৈধ দরদাতা ছিলেন টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সভাপতির ভাই কানন সরকার। তিনি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেশি দর দিয়ে হাটটি ইজারা পান।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, “আগ্রহ কম” থাকায় প্রতিযোগিতা হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি—এটি ছিল পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ।

খুলনায় বিএনপি নেতাদের দখলে হাট

খুলনার তেরখাদার ইখড়ি হাটে রাজস্ব কমার চিত্র সবচেয়ে নাটকীয়।
২০২৫ সালে ৯৫ লাখ টাকায় ইজারা হওয়া হাটটি এবার ইজারা হয়েছে মাত্র ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায়। দুইবারই ইজারা পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিল্টন হোসেন মুন্সী।

অন্যদিকে ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া বড় হাটে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করেও কেউ অংশ নেয়নি। পরে প্রশাসনের নামে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি নেতাদের সমঝোতার কারণেই কেউ দরপত্রে অংশ নিতে সাহস পাননি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে দলীয় প্রভাব ছিল, এখন সেই জায়গা নিয়েছে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীরা।

মানিকগঞ্জে পাঁচবার টেন্ডারেও সাড়া নেই-মানিকগঞ্জের সিরাজপুর পশুর হাটে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত খাস আদায়ে যাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন।

অন্যদিকে আরিচা পশুর হাটে গতবারের তুলনায় সামান্য কম দামে ইজারা হয়েছে।
ব্যতিক্রম চাঁপাইনবাবগঞ্জ

যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমছে রাজস্ব, সেখানে ব্যতিক্রম চাঁপাইনবাবগঞ্জ। নাচোল উপজেলার সোনাইচণ্ডী হাট এবার ইজারা হয়েছে ৭ কোটি ৫ লাখ টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় বেশি।
এছাড়া শিবগঞ্জের তক্তিপুর হাটও বেড়ে ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়।

তবে এখানেও বিএনপি ও জামায়াত-ঘনিষ্ঠ নেতাদের শেয়ার থাকার অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্নের মুখে দরপত্রের স্বচ্ছতা-
স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা বারবার “নীতিমালা অনুযায়ী” ইজারা দেওয়ার কথা বললেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

যেখানে বহু শিডিউল বিক্রি হয় কিন্তু জমা পড়ে একটি দরপত্র, যেখানে প্রতিযোগী ব্যবসায়ীরা শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান, যেখানে খাস আদায়ের নামে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা হাট চালান—সেখানে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশুর হাট এখন শুধু কোরবানির বাজার নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।