বিধিমালা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও পেশাগত নৈতিকতাকে উপেক্ষা করে বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্বে আধিপত্য বজায় রাখা, টেন্ডার বাণিজ্যে সিন্ডিকেট গঠন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিলাসবহুল উপঢৌকনের মাধ্যমে অনিয়ম আড়াল করার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের পুরো প্রক্রিয়ায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন গণপূর্ত বিভাগের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রূপম। ইতোমধ্যে বরিশাল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাজ কুমার সাহা জানিয়েছেন, ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে লিখিত ও মৌখিক একাধিক অভিযোগ তাদের হাতে এসেছে। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরির অভিযোগ
৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা এবং ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তঘর এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আলমের সরকারি চাকরিতে প্রবেশ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যে সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগ দেন, সেটি ভুয়া।
অভিযোগ অনুযায়ী, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিষয়টি চাপা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা আবার সামনে এসেছে। এ বিষয়ে তার কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও অভিযোগের সত্যতা খণ্ডনে তিনি প্রকাশ্যে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর সফর ঘিরে ‘উপঢৌকন’ বিতর্ক
সম্প্রতি গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান বরিশাল সফরে গেলে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিপুল মূল্যের স্বর্ণালংকার ও দামি শাড়ি কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এই পুরো কেনাকাটা এবং কথিত অবৈধ অর্থ লেনদেনের তদারকিতে ছিলেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রূপম। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সফরকে কেন্দ্র করে অধস্তন কর্মকর্তার এমন বিলাসবহুল আপ্যায়ন ও উপঢৌকন মূলত নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও অনিয়ম আড়াল করার কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঝালকাঠিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘আমুর পালকপুত্র’ বলেও ডাকা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সে সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সাধারণ ঠিকাদাররা লিখিত অভিযোগ দিলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বরিশালে বদলির পরও একই ধারা অব্যাহত রাখেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত ছিলেন এবং প্রকাশ্যে নৌকার ব্যাজ পরে চলাফেরা করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শত শত কোটি টাকার প্রকল্পে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সাধারণ ঠিকাদারদের বঞ্চিত করে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফয়সাল আলমের প্রত্যক্ষ তদারকি এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রূপমের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
. খান বিল্ডার্স
. খান ট্রেডার্স
. বাবর অ্যাসোসিয়েটস
. এসএ এন্টারপ্রাইজ
এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বরিশাল মেরিন একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, ক্যান্সার হাসপাতাল, বিটাক, তালতলী মডেল মসজিদ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিমানবন্দর থানা ভবন এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ক্যান্সার হাসপাতাল প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ
ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর নতুন করে বাজেট বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) নামে পুনরায় টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, লিড পার্টনারের ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। এছাড়া প্রতিটি বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ফয়সাল আলম ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে।
প্রতিবাদ করায় ঠিকাদারদের হুমকি
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানাতে গেলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিল কিংবা কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।
দুদকের নজরে অভিযোগ
বরিশাল দুদকের উপ-পরিচালক রাজ কুমার সাহা জানিয়েছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে এবং লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শেষে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং স্থানীয় সাধারণ ঠিকাদারদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হলে তা ন্যায্য প্রতিযোগিতা নষ্ট করে, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয়গুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
