মঙ্গলবার, ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে রায়না চক্রের নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ, দুদকে অভিযোগের প্রস্তুতি

বিশেষ প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ ১১:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

‘পছন্দের লোক’কে সুবিধা দিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ; অঘোষিত ‘সচিব’ হিসেবে প্রভাব বিস্তারের দাবি, বদলি হলেও বহাল থাকার নেপথ্যেও অদৃশ্য ক্ষমতার অভিযোগ। ফাইল ফটো

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনু বিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়া ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দপ্তরটির একাধিক সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মনীতি অনুসরণের পরিবর্তে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় গোপনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের তীর প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদের দিকে। সূত্রগুলোর দাবি, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত অযোগ্য ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রায়না আহমদের ঘনিষ্ঠ ‘চক্র’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সিস্টেম এনালিস্ট এটিএন আলিমুজ্জামান, প্রোগ্রামার মো. আমিনুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-২ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, সহকারী লাইব্রেরিয়ান নুর-এ জান্নাত, কেয়ারটেকার মো. সাকিল এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহাবুব আলমকে রায়না আহমদের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সূত্রের দাবি, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বিভিন্ন অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন।

অন্যদিকে মো. উজ্জল (বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা), মো. হাসান আলী (বর্তমান ব্যক্তিগত কর্মকর্তা), মোছা. আমেনা বেগম (আইন-১ শাখার অফিস সহকারী), মো. সেলিম (প্রশাসন-২ শাখার অফিস সহকারী) এবং বেগম নাসরিন আক্তার (হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা)—এই পাঁচজনকে নিয়ম উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এর মধ্যে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা বেগম নাসরিন আক্তারের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরি করার অভিযোগও রয়েছে। তবে তার সনদ জাল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নথিভিত্তিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘সার্টিফিকেট জাল হলে প্রমোশন হতো না’

বেগম নাসরিন আক্তারের একাডেমিক সনদ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়। প্রায় ১৫ মিনিটের কথোপকথনে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তার বক্তব্যের শব্দচয়ন ও উচ্চারণ অপরিবর্তিত রেখে কথোপকথনটি তুলে ধরা হলো—

যে আপনাকে এই তথ্য দিয়েছে, দেখেন, তার নিজের অপরাধের অভাব নাই। প্রত্যেকের ঘরে-বাইরে শত্রু আছে। আমারও আছে। আমি এসএসসির পরে একদিনও সময় নষ্ট করিনি, ১৯৮৮ সালে আমার চাকরি হয়েছে। তখন চাকরি নিয়েছি অফিস সহকারী ও মুদ্রাক্ষরিক পদে। এর পরে আমার তিনটি পদোন্নতি হয়েছে। আরও দুই বছর চাকরি আছে। সার্টিফিকেট জাল থাকলে তো পদোন্নতি হতো না।

তিনি আরও বলেন—

এ বিষয়ে ২০০৬ সাল থেকে কিছু শয়তান সাংবাদিক আমার তথ্য খোঁজাখুঁজি শুরু করছে। ২০০৯ সালে এক শয়তান সাংবাদিক আমার তথ্য চাওয়ার পরে কাকরাইল মসজিদের সামনে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আপনাকে যে তথ্য দিয়েছে, ওই শয়তান সাংবাদিক তার আপন বোনজামাই।

অভিযোগকারীর পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন—

আমার মন্ত্রণালয়ের ওই শয়তানের সঙ্গে আপনি জিজ্ঞেস করে জানতে পারবেন, তার আপন বোনজামাই। এমন শয়তান আমার জা মানুষের হয়! সেটা ভাবতেই ঘৃণা হয়। আপনি ওই শয়তানকে জিজ্ঞেস করেন, তোর কী কী ত্রুটি আছে। আমি তো অন্যের ত্রুটির তথ্য দেব না।

নাসরিন আক্তার বলেন—

জাল সার্টিফিকেট তথ্য প্রথম ২০০৬ সালে যখন সাংবাদিকরা জানতে চায়, তখনই বুঝছি ওই শয়তান তথ্য দিয়েছে। আমার স্বামী তখন আমাকে বলেছিল, যাও, ওরে গিয়ে দুগালে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দাও। আমি তো নিজের ‘জা’-কে থাপ্পড় মারতে পারি না। এসব ঘটনার কারণেই আমার স্বামী তখন হার্ট অ্যাটাক করে। সেই সময় (২০ বছর আগে) সচিব নিজ উদ্যোগে আমার স্বামীর চিকিৎসা করেছিল। এসব ঘটনার কারণেই আমার সন্তানটাও আজ দূরে।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন—

আর আমার অপরাধ হলো, আমি আমার হাসব্যান্ডের স্ত্রী। আপনি যদি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, তাহলে সচিব স্যারের পারমিশন নিয়ে আসেন, আমি সব কথা বলব। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা সচিবের দপ্তরের বাইরে এ বিষয়ে কেউ তদন্ত করতে পারবে না।

দুদকের প্রসঙ্গে তার বক্তব্য—

ওই শয়তান দুদকের চিঠি নিয়ে এসেছিল একবার। কী হবে তাতে। আমাদের সচিব গিয়ে দুদকের সচিব হয়েছিল। কোথাকার একটি সীলমোহর দিয়ে দুদকের চিঠি নিয়ে এসেছিল। এতে আমার কিছু হবে না।

পদোন্নতির বিষয়ে তিনি বলেন—

আপনি বলেন, আমার তিনটি প্রমোশন হলো কি এমনই! আমার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং পিএসসি মিলে এমন প্রমোশন হয়েছে। আমার মন্ত্রণালয় না হয় আমি ম্যানেজ করলাম, পিএসসি ও অন্য মন্ত্রণালয় কি ম্যানেজ করা সম্ভব? আপনি বলেন।

শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন—

আমি এখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আমার আপন জা এত বড় অসভ্য, তা আর কী বলব। যাই হোক, আপনাকে অনেক কথাই বলে ফেললাম, সরি।

একাডেমিক তথ্য দিতে ‘অনুমতি’র শর্ত

বেগম নাসরিন আক্তারের একাডেমিক তথ্য জানতে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-১ হাসান ইমামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, তথ্য অধিকার আইনে লিখিতভাবে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টদের অনুমতি সাপেক্ষে তিনি তথ্য দিতে পারবেন।

সরাসরি এভাবে তথ্য দেওয়া কিছুটা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

‘অঘোষিত সচিব’—এমন অভিযোগও

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, একই মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার অযোগ্য ব্যক্তিদের আর্থিক অবৈধ লেনদেনের সঙ্গেও নেপথ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

পদোন্নতি, বদলি কিংবা যেকোনো প্রশাসনিক কাজে রায়না আহমদ প্রভাব বিস্তার করে অধস্তন কর্মচারীদের কাছে নিজেকে অঘোষিত ‘সচিব’ হিসেবে উপস্থাপন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও টেন্ডার নিয়েও তার বিরুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

তার একান্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, “রায়না ম্যাম পাট মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সিদ্ধান্ত এখানে শেষ কথা।

তবে ওই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বদলি হলেও ‘বহাল’ কীভাবে?

রায়না আহমদকে একাধিকবার বদলি করা হলেও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে তিনি বদলি ঠেকিয়ে একই মন্ত্রণালয়ে থেকে গেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এসব অভিযোগ জানানো হলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে চাইলে তারা জানান, যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখা হবে। তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বাস্তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার বিকেল ৪টায় তার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

বদলির খবরই জানেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা

মন্ত্রণালয়ের বেওবি অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. মো. মনজুরুল ইসলাম বলেন, রায়না আহমদের বদলির বিষয়ে তিনি অবগত নন।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ রায়না আহমদকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়েই বহাল থাকেন বলে জানা গেছে।

এর আগেও তাকে অন্যত্র বদলির খবর পাওয়া গেলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।

চক্রের’ আরও দুই সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব জিল্লুর রহমান এবং বেওবি শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জুয়েল মোল্যার বিরুদ্ধেও রায়না আহমদের নেতৃত্বে বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন সরকারের সময় নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা প্রচার করে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। অধস্তন কর্মচারীদের হয়রানির মধ্যে রাখা এবং সুবিধা নিয়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পদোন্নতি বা অন্যান্য সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ভুক্তভোগীরা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার না পেয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞের চোখে সুশাসনের সংকট

এশিয়ান ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ড. আনিসুর রহমান বলেন, সমন্বিত অগ্রগতি পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, সমন্বয়ের অভাব, সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বৈষম্য।

তার মতে, সামষ্টিক উন্নয়ন কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো দেশ, সমাজ বা অঞ্চলের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও অনিয়ম দূর করে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং নথিভিত্তিক সত্যতা যাচাই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।