মঙ্গলবার, ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিআইডব্লিউটিএতে দুর্নীতির ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’? সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগে নতুন করে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ৮, ২০২৬ ২:০৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)—নদী, নৌপথ ও বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাটিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, ড্রেজিং কার্যক্রমে অনিয়ম, নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা, ঘাট ইজারা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এখন প্রশ্নের মুখে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং বিআইডব্লিউটিএর প্রভাবশালী কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে নৌখাতের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। আর সেই বলয়ের কেন্দ্রেই ছিলেন কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

দুদকের অনুসন্ধান : কেন নড়েচড়ে বসেছিল কমিশন?

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের স্মারক নং-০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩ অনুযায়ী এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তদন্ত টিম গঠন করা হয়। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে জারি করা তাগিদপত্রে বিআইডব্লিউটিএর কাছে বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য চাওয়া হয়।

দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। অনুসন্ধানের স্বার্থে নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট নদীবন্দরের রাজস্ব আদায়ের হিসাব, সরকারি কোষাগারে জমা সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক হিসাব, চাকরির নথি, বেতন-ভাতা এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবসা ও শেয়ার মালিকানার তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

দুদকের এই পদক্ষেপ থেকেই স্পষ্ট হয় যে অভিযোগগুলোকে কেবল গুঞ্জন হিসেবে নয়, বরং গুরুত্বের সঙ্গে যাচাইয়ের পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগের তীর সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দিকেও

দুদকে জমা দেওয়া ২৭ আগস্ট ২০২৪ সালের এক অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, বিগত সরকারের আমলে বিআইডব্লিউটিএর একাধিক বৃহৎ প্রকল্প, ড্রেজিং কার্যক্রম, নদী খনন, ড্রেজার সংগ্রহ এবং ইজারা ব্যবস্থাপনা রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় পরিচালিত হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সময় কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, সময়সীমা সম্প্রসারণ এবং ড্রেজিং প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়।

আরিফ উদ্দিনকে ঘিরে কেন এত বিতর্ক?

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নদীতীর উচ্ছেদ অভিযান, ফোরশোর লিজ, ঘাট ইজারা, নিলাম কার্যক্রম, বন্দর প্রশাসন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

নদীতীর উচ্ছেদ কার্যক্রমে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত,

ফোরশোর লিজ ও ঘাট ইজারা ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ,

নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন,

বন্দর প্রশাসনে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ,

সরকারি রাজস্ব আদায়ে অসঙ্গতির অভিযোগ,

সম্পদের উৎস নিয়ে রহস্য।

সম্পদের পাহাড়, নাকি বৈধ বিনিয়োগ?

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এ কে এম আরিফ উদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, এলিফ্যান্ট রোড এবং পাবনার সুজানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।

অভিযোগকারীরা এসব সম্পদের উৎস, অর্থের জোগান এবং সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এ কারণেই দুদক তার পরিবার-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা, শেয়ার মালিকানা ও সম্পদসংক্রান্ত নথি চেয়েছিল।

সদরঘাট টার্মিনালের টেন্ডারে ‘অদৃশ্য পরিবর্তন’?

সদরঘাট টার্মিনালের লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত প্রথম টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ৪ মে ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে আর রাখা হয়নি।

অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

কক্সবাজার ও মাতারবাড়ি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ও আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক অভিযোগে কক্সবাজারে বিআইডব্লিউটিএর সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি সম্পদের মূল্যায়ন, ড্রেজড মেটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে দেশ-

বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের পর জনমনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—

অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা কতটুকু?

দুদকের অনুসন্ধান বর্তমানে কোন পর্যায়ে?

চাওয়া নথিপত্রে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে?

ড্রেজিং প্রকল্প ও ইজারা ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত?

সম্পদের উৎস সংক্রান্ত অভিযোগে তদন্তে কী উঠে এসেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে দুদকের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত কার্যক্রমের ফলাফলের ওপর।

বক্তব্য মেলেনি আরিফের-প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ