পিরোজপুর জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এবং কোনো ধরনের ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন না করেই শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বহুল আলোচিত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় সরকারি অর্থ লুটপাট, অনিয়ম, ঘুষবাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের অবৈধ বিল অনুমোদন করেন। একাধিক অভিযোগের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও এখনও তিনি আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন রঞ্জিত দে পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তার পূর্বসূরি আব্দুস সাত্তারের সময়কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।
মঠবাড়িয়া উপজেলার শিংগা গ্রামের বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন গত ৬ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী, ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কাজ না করেই বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় শত কোটি টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ভান্ডারিয়ার ইফতি ইটিসিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো কাজ ছাড়াই ৮৯ কোটি টাকা বিল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১৪ নভেম্বর রঞ্জিত দে-কে কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। পরে ২৮ নভেম্বর বিভিন্ন কৌশলে সেই আদেশ স্থগিত করাতে সক্ষম হন। এরপর রাষ্ট্রপতির আদেশে ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় বদলির নির্দেশ এলেও রহস্যজনক কারণে তিনি দীর্ঘ সময় স্বপদে বহাল থাকেন।
একাধিক অভিযোগ ও আবেদন জমা পড়ার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর তাকে পুনরায় সাময়িক বরখাস্ত করে। বরখাস্তের পর তিনি কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন।
একটি সূত্রের দাবি, পিরোজপুর ছাড়ার পর তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে এসে নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা চালান।
বর্তমানে তিনি ঢাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পুনর্বহাল হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি স্বপদে বহাল ছিলেন। আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা এতে চরমভাবে শঙ্কিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, তিনি অফিসে অনিয়মিত ছিলেন এবং পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে কাজ ভাগিয়ে দিতেন। কাজ না করেই শত কোটি টাকার বিল অনুমোদন করেছেন। আমারও বড় অঙ্কের বিল আটকে রয়েছে। প্রকাশ্যে কিছু বললে সমস্যায় পড়তে হবে।
সূত্র আরও জানায়, নেছারাবাদ উপজেলার শফিক সুমন নামে এক ঠিকাদারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো কাজ সম্পন্ন না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২২ কোটি টাকা বিল অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, কাজ না করেই ঠিকাদারকে টাকা দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ আদৌ হবে কি না জানি না। আমরা সাধারণ মানুষ এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ।
পিরোজপুরের সাধারণ মানুষ ও নিয়মিত ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার, ঘুষবাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে দ্রুত আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাহস না পায়।
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
