রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঘিরে আবারও উঠেছে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রভাব খাটানোর বিস্ফোরক অভিযোগ। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রাজউকের ইমারত পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ (ওরফে জামিল)। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগে অনিয়ম, কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ভবন মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ ভবনকে সুরক্ষা দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ উঠলেও আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষায় অন্য একজন অংশ নিলেও ভাইভা দেন আবুল কালাম আজাদ নিজেই। এছাড়া ভাইভা বোর্ডের কয়েকজনকে প্রভাবিত করে চাকরি পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এলেও রহস্যজনক কারণে কোনো তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ।
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার শেরখালী গ্রামের মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে আবুল কালাম আজাদ ২০১৮ সালে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে রাজউকে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হেমায়েতপুরে কটেজ, শাহজাদপুরে আলিশান বাড়ি এবং রাজধানীতে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত।
ঘুষের অভিযোগে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য
জাকির পাটোয়ারী নামে এক ব্যক্তি ২৮ মার্চ ২০২৩ তারিখে আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জোন-৪-এ যোগদানের পর তিনি পূর্ব বাড্ডার একটি প্ল্যানবিহীন ভবনের মালিকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা, উত্তর বাড্ডার একটি ভবনের মালিকের কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, জরিমানার রসিদ না দিয়ে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
একই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, পূর্ব বাড্ডার দক্ষিণ আনন্দনগরের একটি অনুমোদনহীন ১০ তলা ভবনের মালিকের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা নিয়ে ভবনটি রক্ষায় উচ্চ আদালতে রিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
মোবাইল কোর্টকে ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
২৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে রাজউকের মহাখালী জোন-৩/২ এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টের পর আবুল কালাম আজাদ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, তার কথামতো কাজ না করলে ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বৈদ্যুতিক মিটার খুলে নেওয়া কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হতো।
অভিযোগ অনুযায়ী—
মধ্য পীরেরবাগের একটি ভবনের মালিকের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অন্য একটি ভবনের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে পাঠিয়ে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
৩০৭/১/বি/১ নম্বর হোল্ডিংয়ের মালিকের কাছ থেকে একটি রেস্টুরেন্টে ২ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে, যদিও পরবর্তীতে সেই ভবনের মিটার খুলে নেওয়া হয়।
আরও একটি ভবনের মালিকের কাছ থেকে তিন দফায় ৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অর্থ লেনদেনের বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
জিআরএসে অভিযোগ, তবুও নেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা
ভুক্তভোগীদের একজন সরকারের জিআরএস পোর্টালে অভিযোগ দাখিল করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের ট্র্যাকিং নম্বর ০১৮১৮৬৫৬৭৫০০০০১। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও কোনো কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ, তবুও নীরব রাজউক
২০২৩ সালে বিভিন্ন জাতীয় ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের শিরোনামগুলোর মধ্যে ছিল-
. নির্মাণে রাজউকের অনুমতি নেই, বিক্রি হচ্ছে ফ্ল্যাট।
. রাজউক আমার হাতের মুঠোয় বলে হুমকি ভবন মালিকের।
. রাজউকের শত্রু রাজউক কর্মকর্তা।
. রাজধানীর পূর্ব বাড্ডায় অবৈধ বাড়ি নির্মাণের হিড়িক, নিশ্চুপ রাজউক।
. বাড্ডা এলাকায় গড়ছেন বহুতল মৃত্যুকূপ, দৃষ্টিগোচর হয় না রাজউকের।
এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পরও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
রাইসা বিল্ডার্সকে ঘিরেও অভিযোগ
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদন ছাড়া আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের অভিযোগ থাকা একটি প্রকল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে রাইসা বিল্ডার্স থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদক বিষয়টি নিয়ে আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বিষয়ে অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী শেগুফতা শারমীন আশরাফ এবং জোন-৩ পরিচালক সালেহ আহমদ জাকারিয়ার কাছ থেকেও স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
২০ মে ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ২ জন পরিদর্শকের কাজ ১ জনকে দিয়ে করাচ্ছেন রাজউক জোন-৩ পরিচালক জাকারিয়া” শীর্ষক সংবাদ প্রকাশের পর পরিচালক সালেহ আহমদ জাকারিয়া প্রতিবেদককে অফিসে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে সব সমাধান করার কথা বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও জাকারিয়া সালেহ জোন-৬/১ এ দায়িত্ব পালন কালে অনিয়মের বিস্তারিত পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। অথরাইজড অফিসার ছোটন দেবনাথ এর সব অপকর্মের অদৃশ্য হুকুম দাতা পরিচালক জাকারিয়া সালেহ। তিনি দায় এড়াতে পারেন না।
এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—জোন-৩-এর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পেছনে পরিচালকের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না। তবে এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ, তবুও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়গুলো রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ড. মো. আলম মোস্তফা এবং পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) এ.বি.এম. এহছানুল মামুনের কাছেও একাধিকবার উত্থাপন করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, জমা দেওয়া নথি হারিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয় এবং পরে পুনরায় নথি জমা দিতে বলা হয়।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—এত অভিযোগ, এত সংবাদ প্রকাশ, এত লিখিত তথ্য-উপাত্ত জমা দেওয়ার পরও কেন কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? অভিযোগকারীদের ভাষায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে যদি অভিযুক্তরাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?”
উল্লেখ্য যে, এই প্রতিবেদনে বর্ণিত সব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী ও বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত বক্তব্য এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হলে তা সংযোজন বা হালনাগাদ করা উচিত।
