বুধবার, ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং নিয়োগে ঘুষের সিন্ডিকেটের অভিযোগ, অভিজ্ঞ কর্মীদের বাদ দিয়ে ‘টাকার বিনিময়ে চাকরি’

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২২, ২০২৬ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঘুষ, অনিয়ম ও চাকরি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ৮ থেকে ১৬ বছর কর্মরত বহু অভিজ্ঞ কর্মীকে বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নতুনদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন (দুলাল)। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান এবং উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

নিয়োগবঞ্চিত আউটসোর্সিং কর্মচারীদের দাবি, বছরের পর বছর দায়িত্ব পালনের পরও পুনর্নিয়োগের জন্য তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—টাকা ছাড়া কোনো পুরাতন কর্মী চাকরিতে ফিরতে পারবেন না। প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে না পারায় অনেকের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ওঠেনি বলে অভিযোগ করেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে ই-জিপি প্যাকেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের কাজ পায় পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দিন এবং পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার সাবমিশনের সময় যাদের বায়োডাটা আপলোড করা হয়েছিল, তাদের অনেকের নামই চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকায় রাখা হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আউটসোর্সিং নীতিমালায় অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, টেন্ডারের মাধ্যমে ৩৬ জনের নিয়োগ হলেও পুরোনো কর্মচারীদের মধ্যে প্রথমে ১৬ জন এবং পরে আরও ৪ জনকে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সুইপার, ঝাড়ুদার, ক্লিনার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ১৬ জন অভিজ্ঞ কর্মী প্রত্যাশিত অর্থ দিতে না পারায় নিয়োগ থেকে বাদ পড়েন বলে দাবি করেছেন তারা।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, পরিচ্ছন্নকর্মী বন্যা রানী ও জয় ডোম-১-এর কাছ থেকে চাকরির আশ্বাস দিয়ে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিচ্ছন্নকর্মী মঞ্জু রানীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা এবং লিফটম্যান মো. সুমন মিয়ার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, চাকরিতে পুনর্বহাল ও তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে এসব অর্থ নেওয়া হয়েছে।

লিফটম্যান সুমন মিয়া বলেন, চাকরির জন্য তিনি ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনের নম্বরে পাঠানো হয় এবং বাকি ৪০ হাজার টাকা তার ভাগ্নে রায়হান গ্রহণ করেন। পরে আরও টাকা দাবি করা হলে তিনি তা দিতে রাজি না হওয়ায় তার নাম চূড়ান্ত তালিকায় ওঠেনি বলে অভিযোগ করেন।

আউটসোর্সিং কর্মচারী এনায়েত হোসেন দাবি করেন, পরিবহন কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন প্রধান তার কাছেও এক লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা দিতে না পারায় তাকে নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অপর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, চাকরির জন্য প্রথমে এক লাখ টাকা নেওয়ার পর আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় একজনকে বাদ দেওয়া হলেও তার ভাইয়ের নাম অর্থের বিনিময়ে বহাল রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিরাপত্তা প্রহরী মো. ওবায়দুর রহমান বাবু বলেন, এখানে টাকা ছাড়া কোনো নিয়োগ হয়নি। কেউ ৫০ হাজার, কেউ এক লাখ টাকা দিয়েছে। যারা দিতে পারেনি, তাদের নাম তালিকায় ওঠেনি। আমরা বহু বছর ধরে কাজ করছি, অথচ আমাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী কয়েকজন কর্মীর দাবি, পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন (দুলাল) তাদের বলেছেন, ১২ লাখ টাকা দিয়ে টেন্ডার নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ওই অর্থ নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দিনকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং ডা. নাছির উদ্দিন তা অস্বীকার করেছেন।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ জুলাই নিয়োগবঞ্চিত কর্মীরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ উপস্থাপন করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেন এবং কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করেন। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় পরিবহন কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন প্রধান টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং এডিজি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। তবে এই দাবির স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান বলেন, আমি কারও কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেইনি। যারা অভিযোগ করছে তারা মিথ্যা বলছে।

এডিজির কাছে স্বীকারোক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দুইজন টাকা নিয়ে আমাকে দিতে চেয়েছিল। আমি টাকা ধরিনি। তারা আমার টেবিলে রেখে গেছে। এজন্য আমি দায়ী নই।

অন্যদিকে উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. নাছির উদ্দিন বলেন, আমি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব। আমার জানা মতে সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই নিয়োগ হয়েছে। কেউ অনিয়ম করে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, পিমা এসোসিয়েটসের কাছ থেকে তিনি কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন (দুলাল)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তী কয়েকদিন একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগগুলো সত্য হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে নিয়োগবঞ্চিত ১৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে লিখিত আবেদন করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের চাকরি বহালের দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ আমার কানেও এসেছে। প্রাথমিকভাবে এক দফা তদন্ত হয়েছে। আরও গভীর তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় নানা সমস্যা রয়েছে। দেখা যায় ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও কর্মচারী পান ২০ হাজার টাকা। আমরা আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে কীভাবে রাজস্ব খাতে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও ভাবছি।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগ অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ