রংপুর নগরীর ঐতিহাসিক শ্যামাসুন্দরী খালকে ঘিরে একসময় ছিল নগরবাসীর গর্ব। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় হারিয়ে যেতে বসা সেই খাল পুনরুদ্ধারের জন্য নেওয়া প্রায় ১৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প এখন নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। খাল পুনঃখনন, পরিবেশ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের আশায় শুরু হওয়া এই প্রকল্পকে ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম।
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ—যে প্রকল্প নগরবাসীকে স্বস্তি দেওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং বাস্তবায়ন সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের অনেকাংশই অস্বীকার করেছে এবং প্রকল্পকে চলমান ও নিয়মতান্ত্রিক বলে দাবি করেছে।
খনন হচ্ছে, নাকি মাটি আবার খালেই ফিরছে?
প্রকল্প এলাকায় ঘুরে আসা স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল থেকে উত্তোলিত মাটি দীর্ঘ সময় পাড়ে ফেলে রাখা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই মাটির একটি অংশ আবার খালে ফিরে যাচ্ছে। এতে খনন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, যেখানে আধুনিক ও কার্যকর ড্রেজিং পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল, সেখানে সীমিত যন্ত্রপাতি ও অপরিকল্পিত পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। অনেকের প্রশ্ন—১৫ কোটি টাকার প্রকল্পে যদি খননের মান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল কীভাবে অর্জিত হবে?
দখলদার বহাল, উন্নয়ন কতটা বাস্তব?
খাল পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলকে চিহ্নিত করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, অনেক এলাকায় দখল উচ্ছেদ না করেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খালের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা বহাল রেখে খনন কার্যক্রম চালানো মানে সমস্যার মূল কারণকে অক্ষত রাখা। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও খাল আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধুমাত্র খনন নয়; নদী-খাল সংযোগ পুনরুদ্ধার, দখলমুক্তকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প টেকসই ফল দিতে পারে না।
ঠিকাদারি নিয়ে নতুন প্রশ্ন-
প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সাব-কনট্রাক্টের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে কাজের মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে এই সাব-কনট্রাক্ট ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ দাবি করেছে, সব কাজ নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে এবং অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
তদারকির ঘাটতি নাকি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা?
পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন—প্রকল্পের কার্যকর তদারকি কি আদৌ হচ্ছে?
অভিযোগকারীদের দাবি, মাঠপর্যায়ে যথাযথ মনিটরিং না থাকায় ঠিকাদাররা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধামতো কাজ করছে। আর এ কারণেই কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে এত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই অভিযোগের আঙুল গিয়ে ঠেকেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের দিকে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নাধীন এবং প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে বলেও তারা জানিয়েছেন।
পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি আলোচিত অভিযোগ হলো—ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব দাবিকে যাচাইবিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন।
তবুও জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যদি সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্প ঘিরে এত অসন্তোষ ও বিতর্ক কেন?
১৫ কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু আস্থা সংকটে নগরবাসী
প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ কাজ শেষ হতে এখনো সময় রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের শুরুতেই যখন কাজের মান, ব্যয়, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন ভবিষ্যৎ সফলতা নিয়েও সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
নগরবাসীর অনেকেই বলছেন, শ্যামাসুন্দরী খাল শুধু একটি জলাধার নয়; এটি রংপুরের ইতিহাস, পরিবেশ ও নগর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো শহর।
তদন্তের দাবি জোরালো
সুশীল সমাজ ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, খনন কার্যক্রম, ঠিকাদার নিয়োগ এবং তদারকি ব্যবস্থার ওপর স্বাধীন ও স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি প্রকল্পে কোনো ধরনের প্রশ্নের অবকাশ থাকা উচিত নয়। আর যদি কোথাও অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে শ্যামাসুন্দরী খাল প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায় প্রমাণিত হয়নি। তবে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—রংপুরের প্রাণ ফিরিয়ে আনার এই প্রকল্প কি সত্যিই সফলতার পথে এগোচ্ছে, নাকি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ আবারও হারিয়ে যাচ্ছে বিতর্ক, প্রশ্ন আর জবাবদিহির সংকটে?
সময়ের সঙ্গে সেই উত্তরই এখন খুঁজছে রংপুরবাসী।
