মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১২, ২০২৬ ৫:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি, নীতিনির্ধারণে নতুন দিশা দেখিয়েছে তাঁদের কাজ। মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সংগৃহীত ছবি

২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে যৌথভাবে তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁদের গবেষণা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি প্রণয়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁদের নাম ঘোষণা করে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান

অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি কিংবা দ্রুত প্রবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির এমন জটিল পরিস্থিতিতে কীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে হল ও উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমানো এবং সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদার ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকারও রাজস্ব ও ব্যয়নীতিতে পরিবর্তন আনে।

প্রায় এক শতাব্দী আগে জন মেনার্ড কেইনসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের বিকাশের পর থেকে অর্থনীতির ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে এসব নীতির গুরুত্ব বেড়েছে। তবে ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকটের সময় পশ্চিমা দেশগুলো নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হলে প্রচলিত কেইনসীয় মডেলের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। হল ও উডফোর্ডের গবেষণা সেই ধারাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির মডেলে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

হল ও উডফোর্ডের গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সামষ্টিক অর্থনীতির বিশ্লেষণকে ক্ষুদ্র অর্থনীতির ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত করা। মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মতো সামগ্রিক সূচকগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাঁরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

মানুষের সঞ্চয় ও ব্যয়ের সিদ্ধান্ত, পরিবারের ভোগের ধরন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণের কৌশল সামগ্রিক অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এ ধরনের মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এর ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন পরিবর্তনের পেছনে থাকা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করা এবং সেসব পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা মূল্যায়নেও এসব গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা যেভাবে প্রভাব ফেলে অর্থনীতিতে

হল ও উডফোর্ডের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে না; ভবিষ্যতে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, আয় ও বাজারের অবস্থা কী হতে পারে, সেটিও হিসাব করে।

এ কারণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ঘোষণা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্তা মানুষের ব্যয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারে। একইভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ভবিষ্যৎ চাহিদা ও ব্যয়ের প্রত্যাশা অনুযায়ী পণ্যের দাম এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা নির্ধারণ করে।

এভাবে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, মানুষের প্রত্যাশা এবং বাজারের আচরণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় গবেষণার গুরুত্ব

জ্বালানির দামে আকস্মিক বৃদ্ধি, ভোগব্যয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান কীভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে, তা বোঝা জরুরি।

হল ও উডফোর্ডের গবেষণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও মডেল নীতিনির্ধারকদের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নীতিগত পদক্ষেপের প্রভাব বুঝতে সহায়তা করে। তাঁদের কাজ আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতি ও মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।

গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছিলেন তিনজন

২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট। উদ্ভাবন কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেয়, সে বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের পুরস্কৃত করা হয়। তাঁদের গবেষণায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নতুন উদ্ভাবন এবং পুরোনো উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে ত্বরান্বিত হয়, তা তুলে ধরা হয়েছে।

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস ও প্রদানপ্রক্রিয়া

সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তীকালে অর্থনীতিতে পুরস্কার যুক্ত হয়। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে একটি পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করে, যা ১৯৬৯ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতির এই পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘দ্য সেরিগেস রিক্সব্যাংক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্সেস ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’। এটি আলফ্রেড নোবেলের মূল ইচ্ছাপত্রে উল্লেখিত পাঁচটি পুরস্কারের অংশ নয়; তবে নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে একই ধারায় এর বিজয়ীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কারজয়ীদের নির্বাচন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও অর্থনীতির পুরস্কার সুইডেনের স্টকহোমে এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে প্রদান করা হয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।