সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদ ও পরিচালক হাবিবউল্লাহর নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ; প্রতিবেদককে প্রাণনাশের হুমকি। ফাইল ছবি
দেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। কৃষকের দোরগোড়ায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে এবার উঠেছে নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ।
অভিযোগের তীর উঠেছে সাময়িক বরখাস্তকৃত সাবেক উপপরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ এবং পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহর দিকে। পাশাপাশি সাবেক উপপরিচালক লিসাসা, হাসিবুল হাসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
নিয়োগে কারসাজি, কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৫ সালে কেয়ারটেকার সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে ৯১ জন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং ৩৮ জন ড্রাইভার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে এসব নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে।
সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে চাকরির বিপরীতে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা এবং ড্রাইভার পদে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের মনোনীত প্রার্থীদের চাকরি নিশ্চিত করতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা, প্রক্সি পরীক্ষা এবং প্রশ্ন সরবরাহের মতো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
ডিএইর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত, যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করেন।
মাহবুব গং নিয়ে আতঙ্কের অভিযোগ
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে তাঁর সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলার সাহস অনেকেরই ছিল না। তাঁদের ভাষায়, প্রশাসন শাখায় দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও চাপের একটি পরিবেশ বিরাজ করত এবং অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নানাভাবে চাপে থাকতেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরও মাহবুবুর রশিদ প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন এবং পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
ভুয়া বিল-ভাউচার ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, মেরামত, সংস্কার, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন বরাদ্দের বিপরীতে কমিশন গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসন শাখার অধীনস্থ ৮টি উইং, ১৪টি অঞ্চল, ১৮টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই) এবং ৭২টি হর্টিকালচার সেন্টারের বিভিন্ন কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ড্রাইভারদের মাধ্যমে প্রার্থী সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ সংক্রান্ত প্রার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে কয়েকজন ড্রাইভারকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদের গাড়িচালক রাজ্জাক, আলমগীর হোসেন, আবুল কালাম, নজরুল, হুমায়ুন কবির লিটনসহ কয়েকজনের নাম বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন এদের কেউ কেউ। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ড্রাইভারের বক্তব্য নেওয়া হলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও প্রশাসনিক অবাধ্যতার অভিযোগ
সূত্র জানায়, গত ১২ মে ২০২৫ তারিখে মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিয়ে তিনি পরে জবাব দাখিল করেন, যা প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্যের শামিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
অন্যদিকে, পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহ পিআরএলে যাওয়ার প্রাক্কালে প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বদলি কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদককে প্রাণনাশের হুমকি
এ প্রতিবেদনের অনুসন্ধান চলাকালে একটি বিদেশি নম্বর থেকে নিজেকে “সোহাগ” পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ফোন করে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদকের দাবি, হুমকিদাতা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে “আরাম হারাম করে দেব” মেরে ফেলব—এ ধরনের কথাও বলেছেন।
প্রতিবেদকের কাছে ওই কথোপকথনের কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগ জনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে খুদে বার্তায় তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ তাঁর সময়ে হয়নি এবং তিনি অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যও এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
তদন্তের দাবি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মহল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ যাচাই, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং অভিযুক্তদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব বিষয়ই বিভিন্ন সূত্র, নথিপত্র ও অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সরকারের উপযুক্ত তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
