রবিবার, ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিসিএস ছাড়াই ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ, আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা, একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানের বেতন উত্তোলন—গণপূর্তে জাহাঙ্গীর আলম সিন্ডিকেটের বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ

আবদুর রহমান
জুন ২১, ২০২৬ ২:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নারী কেলেঙ্কারি, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগেও তোলপাড়। ফাইল ছবি

স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে প্রচলিত বিসিএস নিয়োগ পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে ছাত্রলীগপন্থী কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সেই বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের অন্যতম মো. জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিসিএস ছাড়াই সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগের অভিযোগ

সূত্রমতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাধারণত ৯ম গ্রেডে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের বিধান থাকলেও আওয়ামীপন্থী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিশেষ প্রক্রিয়ায় মো. জাহাঙ্গীর আলম, সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান, মো. আবু তালেবসহ কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগের ব্যবস্থা করে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং সাবেক এমপি শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের তদবিরে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) বিশেষ সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুল হককে সরাসরি ফোন করে নির্দেশ দেন, যেন কোনো লিখিত বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র ভাইভার মাধ্যমে নির্ধারিত তালিকার ১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে পিএসসি নামমাত্র ভাইভা নিয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষার অভিযোগ

এই নিয়োগের বিরুদ্ধে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে আদালত ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের আদেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আদালতের সেই আদেশ কার্যত উপেক্ষা করা হয়। বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের শুধু বহালই রাখা হয়নি, বরং সংরক্ষিত কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে তাদের সিনিয়রিটিও প্রদান করা হয়।

একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানের বেতন উত্তোলনের অভিযোগ

সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ হলো—আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে প্রায় ১১ মাস ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদানপত্র তৈরি করা হয় এবং চাকরিতে উপস্থিত না থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বেতন উত্তোলন করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)-এ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছিলেন। একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও তিনি সরকারি বেতন উত্তোলন করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু জাহাঙ্গীর আলম নন, অভিযোগ রয়েছে যে মো. আইয়ুব আলী মেরিন একাডেমিতে এবং মো. নাফিজ আহমেদ রাজশাহীতে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন গ্রহণের পাশাপাশি পরবর্তীতে ব্যাকডেটে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুবিধা ভোগ করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

ক্ষমতাধরদের মদদের অভিযোগ

সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের পেছনে সাবেক সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার, সাবেক এমপি শেখ সেলিম, শেখ হেলাল এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়ার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল।

৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

এদিকে সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘পিপিডব্লিউডি উড ডিভিশন’কে ঘিরেও নতুন করে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের দাবি, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার সংক্রান্ত কাজকে কেন্দ্র করে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম প্রভাবশালী এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে বিশেষ ইউনিটে পদায়ন নেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপির আওতায় থাকা এই প্রকল্পকে দুই ভাগে বিভক্ত করে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। প্রধান প্রকৌশলীর সামনেই সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ থেকে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর ভাই ‘মামুন’-এর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। এই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম।

সূত্রের দাবি, জাহাঙ্গীর আলম নিয়মিতভাবে হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার ও ডট ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ বণ্টন করেন।

তদন্ত চলমান, তবুও টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে পৃথক তদন্ত চলমান থাকার পরও কীভাবে জাহাঙ্গীর আলম প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পান?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব বলেন, রিপোর্টটি আগেই দেওয়ার কথা ছিল। কেন দেওয়া হয়নি জানি না। তবে আমি আবার চিঠি দেব, দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।

নারী কেলেঙ্কারি ও অসদাচরণের অভিযোগ

এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অফিসে জুনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। এমনকি অফিসের ভেতরে এক নারী কর্মকর্তাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ বা ঝাপটে ধরার অভিযোগও উঠেছিল। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে তড়িঘড়ি করে রাজশাহীতে বদলি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে দীর্ঘ সময় ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় অবস্থান করেন এবং প্রায় আট মাসের মাথায় পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও, মুতার বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীর সঙ্গে পরকীয়াসদৃশ সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, এ বিষয়ে আরও তথ্য-প্রমাণ ও ছবি নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

জনমনে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—ক্ষমতার ছত্রছায়া ছাড়া কি একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে এত বড় বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? নাকি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এখনও সক্রিয় রয়েছে আওয়ামী আমলের সেই শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেট?

দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর প্রতি এখন জনসাধারণের একটাই প্রত্যাশা—উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হোক এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

ভুয়া বিয়ের প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী নারীর ছবি সহ থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……….

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ