সিলেটের গোয়াইনঘাট ও সালুটিকর অঞ্চলের নৌ-পথ ইজারা ঘিরে এক নাটকীয় ও রহস্যময় মোড় নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজ-এর মধ্যকার আইনি বিরোধ।
রোববার (২৬ এপ্রিল) আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত শুনানির প্রহর গুনছিল সবাই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যেন অদৃশ্য এক স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল—বিবাদী পক্ষ বিআইডব্লিউটিএ হঠাৎ করেই সরে দাঁড়াল নিজেদের অবস্থান থেকে।
আইনজীবীদের ভাষায়, এটি কেবল পিছু হটা নয়—বরং এক নিঃশব্দ সমঝোতার ইঙ্গিত, যার ছায়ায় ঢাকা পড়ছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।
সিলেট আদালতের জিপি অ্যাডভোকেট শামীম সিদ্দিকী জানান, মামলার কৌশল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। বাদী পক্ষ সরকারকে সরাসরি বিবাদী না করে শুধুমাত্র বিআইডব্লিউটিএ-কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে—যেন রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরই হয়ে পড়ে ক্ষীণ।

তার ভাষায়, বড় অংকের রাজস্ব জড়িত থাকলেও আজ শুনানির দিন বিবাদী পক্ষের অনুপস্থিতি নিছক কাকতালীয় নয়—এর পেছনে নিশ্চয়ই গভীর কোনো কারণ আছে।
আদালতপাড়ায় তখন ফিসফাস—একটি ফোনকল, ওপর মহলের নির্দেশ, আর তাতেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপেই নরম হয়ে যায় বিআইডব্লিউটিএ। এমনকি সংস্থাটির পরিচালক এ.কে.এম. আরিফও স্বীকার করেছেন—মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পরই তারা কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসেন।
এই আকস্মিক নমনীয়তা যেন এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে—পূর্বের স্থগিতাদেশ বহাল থাকার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে ঝুলে আছে।
এদিকে, সময়ের এই দীর্ঘসূত্রতা যেন কারও কারও জন্য আশীর্বাদ। বর্তমান ইজারাগ্রহীতা পাচ্ছেন টোল আদায়ের বাড়তি সুযোগ—আর সরকার? সম্ভাব্য কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এটি শুধুই প্রশাসনিক জটিলতা নয়—বরং এক অদৃশ্য সুবিধার খেলা। মেসার্স এম.এইচ এন্টারপ্রাইজ যেখানে ৫৬ লক্ষ টাকার ক্ষতির কথা বলছে, সেখানে আড়ালে ঘুরছে আরও বড় অঙ্কের হিসাব—রাষ্ট্রীয় রাজস্বের।
শুনানি না হওয়ায় মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এখন স্থবির।
ফলে গোয়াইনঘাটের গুরুত্বপূর্ণ বালু ও পাথর মহালসহ নৌ-ঘাটের ইজারা কার্যক্রম পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়।
নদীর স্রোত থেমে থাকে না—কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার এই ঘূর্ণিপাকে থমকে যেতে পারে গোয়াইনঘাটের নৌ-জীবন। ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই এখন তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত আগামীর দিকে, যেখানে প্রতিটি ঢেউ যেন প্রশ্ন তোলে—
এই পিছু হটা কি কেবল কৌশল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো গল্প?
