কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম–এ মাদককে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের জের ধরে আহত এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ক্ষোভ, শোক আর প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে গেছে দুইটি বসতঘর—যেন এক রাতেই বদলে গেছে জনপদের শান্ত মুখ।
নিহত বশির উদ্দিন (৪৫) পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বৈদ্দেরখিল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত জয়নাল আবেদীনের ছেলে এবং পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সোমবার দিবাগত রাতে তার মৃত্যু হয়।
মাদকের বিরোধ থেকে রক্তাক্ত দ্বন্দ্বের সুচন্দা। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২১ এপ্রিল রাতে বৈদ্দেরখিল গ্রামে মাদক সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে আবু রশিদ ও নাদিরের পক্ষের লোকজনের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে। প্রথমে আবু রশিদকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হলে, তার ছেলে আসিফ ও পারভেজ দলবল নিয়ে পাল্টা হামলা চালায়।
এই সংঘর্ষের মাঝেই শান্তি ফেরাতে এগিয়ে আসেন বশির। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন সহিংসতার শিকার। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে ছিটকে পড়েন তিনি। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। মাথায় জটিল অস্ত্রোপচারসহ দীর্ঘ চিকিৎসার পর অবশেষে হার মানেন বশির—ফিরে যান না আর নিজের জনপদে।
মৃত্যুর পর উত্তেজনা, বশিরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছে।
ভোর রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত আবু রশিদের দুইটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। মুহূর্তেই আগুন গ্রাস করে বসতঘর—ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, ৬ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ৬ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তবর্তী এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে মাদক সিন্ডিকেট। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম শাহীন অভিযোগ করেন—এই সংঘর্ষের পেছনে মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারই মূল কারণ। তার ভাষায়, মাদকের এই অন্ধকার খেলায় নিরীহ মানুষ বলি হচ্ছে। দিনদিনই মাদক নির্মূলে সরকারের জিরো টলারেন্স ভেস্তে যেতে বসেছে।
এদিকে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষই পৃথক মামলা করেছে। বশিরের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এলাকা। তিনি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য যে, একটি জনপদ—যেখানে মানুষের জীবন চলার কথা স্বাভাবিক নিয়মে—সেখানে মাদকের অন্ধকার ছায়া কেড়ে নিল একটি প্রাণ, জ্বালিয়ে দিল ঘর, আর রেখে গেল আতঙ্কের দীর্ঘ ছাপ। চৌদ্দগ্রামের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে—কবে থামবে এই নেশার আগুন, কবে ফিরবে নিরাপদ জনজীবন? কবে শতভাগ নিশ্চিত হবে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা।
