সোমবার, ৯ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুর্নীতির একের পর এক অভিযোগ, তবু ২১ কোটি টাকার এআই প্রকল্পের দায়িত্ব মাসুদের হাতে! চার বিভাগে প্রশিক্ষণের কাজ পেল বিতর্কিত ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ৯, ২০২৬ ১:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার তথ্য ঘিরে তোলপাড়; ৪৮ কোটি টাকা উত্তোলন, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও আলোচনায়। ফাইল ছবি

ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন, হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং একাধিক মামলার অভিযোগ—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ আলম। অতীতের প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এসব বিতর্কের মধ্যেই এবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রায় ২১ কোটি টাকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বড় দুটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল—চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংকে।

শুধু তাই নয়, অতীতের প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ অমান্য করে লেনদেন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সরকারি প্রকল্প বাগিয়ে নিতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রকল্পের আওতায় দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা বিল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই অর্থের একটি অংশ কীভাবে উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এতসব অভিযোগ ও বিতর্কের পরও নতুন সরকারের সময়ে প্রায় ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের দরপত্র মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা যাচাই এবং কার্যাদেশ প্রদানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, অতীতের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করেই কি এত বড় সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?

একাধিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পে কাজ পাওয়ার অভিযোগে আলোচিত ছিলেন মাসুদ আলম। সরকার পরিবর্তনের পরও সরকারি প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

চার বিভাগে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের হাতে

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর দেশের তরুণ-তরুণীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ‘তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৬৪ জেলার বেকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে ৩০০ ঘণ্টার এআই ও জেনারেটিভ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিদিন ২০০ টাকা করে যাতায়াত ও খাবার ভাতা দেওয়ার কথাও রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে কয়েকটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। গত ১৯ জুলাই দরপত্রের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হলে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের দুটি বড় প্যাকেজ—প্যাকেজ ১ ও ৩-এর কাজ পায় মাসুদ আলমের মালিকানাধীন ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড।

অভিযোগ রয়েছে, চারটি বিভাগের প্রশিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা ও উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা, ভাতা বিতরণ এবং সামগ্রিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রকল্পের জবাবদিহি ও নজরদারি নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অস্তিত্বহীন প্রশিক্ষণার্থীর তালিকা তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছিল ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের বিরুদ্ধে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জালিয়াতির তথ্য উঠে আসার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং পূর্ববর্তী কাজের মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষভাবে করা হয়েছে, তা প্রকাশের দাবি উঠেছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা ও পুরস্কার পাওয়ার ইতিহাস

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল মাসুদ আলমের। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাজনৈতিক যোগাযোগের সুবাদে মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রশিক্ষণ প্রকল্পে তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ও কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেন মাসুদ আলম। একই সময়ে সরকারি সমর্থনপুষ্ট ‘বাংলাদেশ যুব কাউন্সিল’-এর সভাপতির দায়িত্বও পান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভেতরে বিগত সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত একটি অংশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অটুট রয়েছে। সেই পুরোনো যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই নতুন সরকারের সময়েও বড় প্রকল্পের কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অবশ্য রাজনৈতিক যোগাযোগ, পুরস্কার গ্রহণ কিংবা সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অতীত কর্মকাণ্ড, দরপত্রে অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং কার্যাদেশ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৪৮ কোটি টাকা উত্তোলন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

মাসুদ আলম ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের আওতায় দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা—প্রতি দফায় ২৪ কোটি টাকা—বিল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নির্দেশনায় মাসুদ আলম, তাঁর স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের কয়েকটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ৩০ জুন ও ৩০ সেপ্টেম্বর ভিত্তিক জমা হওয়া বিলের অর্থ ব্যাংক হিসাব থেকে কৌশলে উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে। উত্তোলিত অর্থের একটি বড় অংশ পলাতক সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং কারাগারে থাকা সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিনের কাছে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অর্থ উত্তোলন, স্থানান্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই এবং তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় সিআর মামলা নং-৪৯৯/২০২৫ এবং দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিশেষ ক্ষমতা আইনে অভিযোগ দায়েরের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অভিযোগ ও তদন্তের বর্তমান অবস্থা, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ এবং অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করা জরুরি।

৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ১০ কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ

মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার একটি সরকারি প্রকল্পের কাজ পাওয়ার উদ্দেশ্যে বর্তমান যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার তৎকালীন এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল।

একই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, উচ্চপর্যায়ের তদবির এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ পাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ঘুষ লেনদেনের কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধান প্রয়োজন।

গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন, পাল্টা প্রতিবাদও প্রকাশ

মাসুদ আলম ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও অনলাইন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব গণমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক আজকের পত্রিকা, দৈনিক ভয়েস নিউজ, ডেইলি সান বাংলা, দৈনিক সময়ের কণ্ঠ, সাপ্তাহিক জনতার মাধ্যম, দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন, ক্রাইম সিক্রেট ডটকম, দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ, জনতার মাধ্যম ডটকম, উদয়ের পথে, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি এবং সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা। অনলাইন অ্যাক্টিভেটসহ আরও কয়েকটি মাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্য রয়েছে।

তবে এসব প্রতিবেদনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও প্রতিবাদও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিশেষ করে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিতে প্রতিবেদন প্রকাশের ছয় দিনের মাথায় পত্রিকাটির সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ প্রকাশের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগ ও প্রতিবাদ—উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করেই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এমএলএম ব্যবসা থেকে প্রমিস গ্রুপ—অতীত নিয়েও প্রশ্ন

ব্যবসায়িক জগতে মাসুদ আলম ‘প্রমিস গ্রুপ’-এর কর্ণধার হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এর আগে ‘নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে এমএলএম ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করে ‘প্রমিস মার্ট’, ‘প্রমিস অ্যাসেট’, ‘প্রমিস টেক’সহ প্রায় ১৫টি কোম্পানি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ সংগ্রহ এবং প্রকৃত মালিকানা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিবন্ধন, আর্থিক বিবরণী, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মাসুদ আলমের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। একসময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে উসকানি, হত্যা এবং সরকারি সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগে প্রায় ৭০টি মামলার তথ্যও সামনে আনা হয়েছে। তবে মামলার সংখ্যা, প্রকৃতি, এজাহারে তাঁর নাম থাকার বিষয়টি এবং প্রতিটি মামলার বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট থানার নথি ও আদালতের তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলা থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।

এআই প্রকল্পের মান ও অর্থ ব্যয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

প্রায় ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মতে, এআই ও জেনারেটিভ প্রযুক্তির মতো আধুনিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হলে প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, ল্যাব ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ উপকরণ এবং বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিশেষ করে ৬৪ জেলার প্রশিক্ষণার্থীদের প্রকৃত উপস্থিতি, ৩০০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ উপকরণের মান এবং দৈনিক ২০০ টাকা ভাতা যথাযথভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অভিযোগ অস্বীকার মাসুদ আলমের

অনিয়ম, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষের সাজানো। যারা সংবাদ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এলাকার লোক হিসেবে সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবি থাকা অপরাধ নয়। দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করেই উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় আমরা কাজ পেয়েছি। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়নি।’

নিয়ম মেনেই কার্যাদেশ, দাবি অধিদপ্তরের

এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিয়মের মধ্য থেকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে অতীতে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কিংবা বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়নে সামান্যতম গাফিলতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

২১ কোটি টাকার প্রকল্পে এখন নজরদারি ও জবাবদিহির প্রশ্ন

সব মিলিয়ে প্রায় ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ প্রকল্পটি এখন শুধু তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং সরকারি প্রকল্পের দরপত্রের স্বচ্ছতা, প্রতিষ্ঠানের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

একদিকে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতের প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অনিয়ম, ব্যাংক লেনদেন, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ঘুষের অভিযোগ; অন্যদিকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সব অভিযোগ অস্বীকার করে উন্মুক্ত দরপত্রে কাজ পাওয়ার দাবি—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান।

বিশেষ করে ৪৮ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশের বাস্তবায়ন, ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এবং বর্তমান এআই প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন—প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা, উপস্থিতি, প্রশিক্ষণের মান, ভাতা বিতরণ ও প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।

সরকারি অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্পে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব নয়, বরং যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য। অন্যথায় তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার নামে নেওয়া প্রায় ২১ কোটি টাকার উদ্যোগটি নতুন করে অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ