জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)-এর অনুসন্ধানে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ২ হাজার ২৩৭ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে মো. লিটন আলীর মালিকানাধীন রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। বিপুল পরিমাণ কাপড় অবৈধভাবে বাজারে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৪১টি ইউডির আওতায় আমদানি, খোলাবাজারে ২,২৩৭ টন কাপড়
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউপির (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) আওতায় বন্ড সুবিধায় মোট ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৩৭ টন কাপড় রাজধানীর ইসলামপুরের খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্য রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহারের জন্য শুল্কমুক্ত বা শুল্ক সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া। কিন্তু সেই সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাপড় রপ্তানি পণ্যে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
আমদানি-রপ্তানির হিসাবে বড় ধরনের গরমিল
সিআইসির পর্যালোচনায় আমদানি ও রপ্তানির তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়েছে। বন্ড সুবিধায় আনা সুতা ও নিট কাপড়ের হিসাব রপ্তানির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে বড় ঘাটতি।
৪১টি ইউডির মধ্যে ৩১টিতেই কোনো রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ৩০টি এন্ট্রিতে আমদানি করা কাপড়ের পুরোটাই অবৈধভাবে অপসারণের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি আরও ১০টি এন্ট্রিতে আংশিক কাপড় সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব এন্ট্রিতে আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব মেলেনি।
মাত্র ১০ মাসে আমদানির ৮২ শতাংশ
গোয়েন্দা পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর মধ্যেই ৪১টি ইউডির বিপরীতে আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশ দেশে আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত এক মাসে এসব কাপড় ব্যবহার করে কোনো পোশাক উৎপাদন কিংবা রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ ইউপির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সংশ্লিষ্ট ইউডিগুলোর বিপরীতে প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হয়েছিল।
আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড়ের বিপরীতে উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য না থাকায় বন্ড সুবিধার ব্যবহার এবং পণ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য
সিআইসির গোয়েন্দা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বন্ডের শর্ত ভঙ্গ করে অবৈধভাবে অপসারণ করা কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
বিপুল অঙ্কের এই রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ দেশের বন্ড ব্যবস্থাপনা, আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কাস্টমসের নজরদারি কোথায়?
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ২ হাজার ২৩৭ টন কাপড় কীভাবে উৎপাদন ও রপ্তানির প্রক্রিয়া এড়িয়ে খোলাবাজারে চলে গেল, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ৪১টি ইউডির বিপরীতে আমদানি, উৎপাদন, মজুত ও রপ্তানির হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে অসাধু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লিটন আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
