সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময় পর বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে বরিশাল এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রহমত-ই-খুদার ক্ষেত্রে যেন সেই নিয়মের ব্যতিক্রমই দেখা যাচ্ছে। কর্মজীবনের শুরু থেকে ঘুরেফিরে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বরিশালেই দায়িত্ব পালন করে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী প্রভাব বলয়—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।
সূত্র জানায়, প্রায় দুই দশক আগে বরিশাল জেলায় প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রহমত-ই-খুদা। এরপর বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি পেলেও কর্মস্থল থেকেছে মূলত বরিশাল। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই অঞ্চলে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যশোরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে বরিশাল নগরীর অক্সফোর্ড মিশন রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সেখানে তার আলিশান বাড়িসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগও রয়েছে।
অক্সফোর্ড মিশন রোডের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম দাবি করেন, রহমত-ই-খুদার স্ত্রী গৃহিণী হলেও তার নামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের তথ্য স্থানীয়ভাবে আলোচিত। ব্যক্তিগতভাবে দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ব্যবহার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে তৎকালীন বরিশাল অঞ্চলের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে আওয়ামীপন্থি কয়েকটি ঠিকাদার গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, বরিশাল জেলার এম মাহফুজ খান, কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ, ভোলা জেলার পিটার এবং পটুয়াখালীর মহিউদ্দিনের সঙ্গে বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে তার অংশীদারত্ব রয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের প্রশাসনিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ২০২৩ সালে সংগঠনটির ৫৭ নম্বর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের বদলি, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব আরও বাড়ে বলে দাবি করেছেন একাধিক সূত্র।
একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বদলি-তদবির বাণিজ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনকি বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ শূন্য হলে নিজের চেয়ে সিনিয়র কর্মকর্তারা থাকা সত্ত্বেও একাধিকবার ওই দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও তিনি প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ হয়নি।
সরকারি চাকরি বিধিমালায় দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন নিরুৎসাহিত করা হলেও বরিশাল অঞ্চলে অনেক কর্মকর্তা পাঁচ বছরের বেশি সময় একই স্থানে কর্মরত রয়েছেন। তবে রহমত-ই-খুদার ক্ষেত্রে সেই সময়কাল দেড় যুগ ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক কর্মকর্তা বলেন, এখনও বদলিসংক্রান্ত কোনো আদেশ জারি হলে নির্বাহী প্রকৌশলী রহমত-ই-খুদা প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর আদেশ পরিবর্তন বা বাতিলের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার একটি সূত্রও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রহমত-ই-খুদার কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। একই বিষয়ে বরিশালের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সূত্রের অভিযোগ ও দাবি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..
