নেপালি গাইড দাওয়া শেরপা। ছবি: সংগৃহীত
এভারেস্টের উচ্চতর অঞ্চল থেকে নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন নেপালি গাইড দাওয়া শেরপা। অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়া, চরম ঠান্ডা এবং দুর্গম পাহাড়ি পরিস্থিতির মধ্যে তিনি একাধিকবার খাদে আটকে পড়া ও তুষারধসের মধ্যেও জীবন রক্ষা করেন।
পরিবার ও সহকর্মীরা তাকে মৃত ধরে নিয়েছিলেন এবং কাঠমান্ডুতে শেষকৃত্যের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি দল তাকে বেস ক্যাম্পের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে নামতে দেখে উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর তাকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি পানিশূন্যতা, তুষারদাহ (ফ্রস্টবাইট) এবং হাড় ভাঙার চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শেষবার যেভাবে দেখা গিয়েছিল
উদ্ধারের আগে ব্রিটিশ পর্বতারোহী ক্রিস থ্রলই ছিলেন শেষ ব্যক্তি, যিনি দাওয়া শেরপাকে জীবিত দেখেছিলেন। প্রায় ৭ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প-৩ এর ওপরে তিনি বিশ্রামরত অবস্থায় তাকে দেখেন। পরে নামার পথে তিনি দলের আরেক সদস্যের সঙ্গে দেখা করেন, যিনি অক্সিজেন ছাড়া এবং তীব্র তুষারদাহে ভুগছিলেন।
মৃত্যুর মুখ থেকে টিকে থাকার লড়াই
দাওয়া শেরপা জানান, অক্সিজেন শেষ হওয়ার পর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছিলেন না। প্রথম দুই দিন তিনি কিছুই খাননি এবং পরে বরফ চিবিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। পকেটে থাকা কয়েকটি চকলেট ও বরফ গলিয়ে পানিই ছিল তার প্রধান ভরসা।
ধীরে ধীরে নামতে গিয়ে তিনি একটি গভীর খাদে (ক্রেভাস) পড়ে যান এবং সেখানে প্রায় আড়াই দিন আটকে থাকেন। কোনো পথ না পেয়ে তিনি সেখানে প্রায় অচল অবস্থায় ছিলেন।
পরবর্তীতে একটি তুষারধস ওই খাদে বরফ জমা করে দিলে তিনি সেটির ওপর ভর করে উপরে ওঠার সুযোগ পান। বের হওয়ার পর কাছাকাছি দড়ি পেয়ে আবার নিচে নামতে থাকেন। আরও একটি তুষারধস তার অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করলেও তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি বলেন, ‘পুরো রাত হেঁটে বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছে যাই।’
সেখানেই প্রায় এক সপ্তাহ পর প্রথমবার মানুষের দেখা পান তিনি। ‘কিছু কর্মী আবর্জনা সংগ্রহ করতে যাচ্ছিল, তাদের সঙ্গে দেখা হয়। তারাই আমাকে নিচে নিয়ে আসে।’
‘অলৌকিক’ বেঁচে ফেরা
দাওয়া শেরপার এই বেঁচে ফেরাকে শেরপা সম্প্রদায় ও পর্বতারোহী মহলে ‘অলৌকিক’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমেই এভারেস্টে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, আর ইতিহাসে ৩০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ৮কে এক্সপেডিশনের নির্বাহী পরিচালক পেম্বা শেরপা বলেন, এটি ছিল “নিজের চেষ্টায় বেঁচে ফেরার অসাধারণ ঘটনা”।
পরিবার ও চিকিৎসকদের বক্তব্য
দাওয়া শেরপার স্ত্রী জানান, তিনি প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং শেষকৃত্যের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবিনি তিনি বেঁচে ফিরবেন।’ কাঠমান্ডুর হ্যামস হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে আইসিইউতে আছেন এবং পানিশূন্যতা থেকে ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন। এদিকে চলতি মৌসুমে এক হাজারের বেশি পর্বতারোহী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছেন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
