সিলেট-ছাতক রেলপথে ফের কবে চলবে ট্রেন—উঠছে প্রশ্ন। ছাতক-সিলেট রেলপথের গোবিন্দগঞ্জ এলাকা। ছবি : সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত ঐতিহাসিক রেলপথটি দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত নির্মিত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ দিয়ে ছাতক থেকে চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হতো। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের মানুষ স্বল্প খরচে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন।
কিন্তু ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের ট্রেন চলাচল। দীর্ঘ সময় রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন, অন্যদিকে রেলপথের মূল্যবান স্লিপার ও লোহার পাত চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
এরপর ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথটি পুনর্বাসনে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ কাজ। গত রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে বিপুল অর্থের এই প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কবে নাগাদ আবার সিলেট-ছাতক রেলপথে ট্রেন চলবে?
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেললাইন পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটির নাম ‘২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’।
জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ক্ষতিগ্রস্ত মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসনের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড (এমএএইচএল)। ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১৭ কোটি টাকার বেশি হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয় ১৯৯ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু সময় শেষ হলেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি। প্রকল্পের আওতায় থাকা ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে রেললাইন স্থাপনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপকের হিসাবে বাস্তবায়নের হার প্রায় ২০ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এরই মধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে।
তবে ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ ধীরগতিতে চলছে বা বন্ধ রয়েছে। নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি থাকায় নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার কোনো দৃশ্যমান সময়সূচি পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই কাজের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ না হওয়ায় কাজ পিছিয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা উজ্জীবক সুজন তালুকদার বলেন, বন্যায় রেলপথের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। নতুন করে সংস্কারকাজ শুরু হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছুদিন বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে দেখা গেলেও পরে অনেক জায়গায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কাজ কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয়রা স্পষ্ট কোনো তথ্য পাচ্ছেন না। ফলে রেলপথ চালু নিয়ে হতাশা বাড়ছে।
ছাতক প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, ছাতকের বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
ছাতক পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসান বলেন, ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে এই রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বল্প খরচে নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ২০২২ সালের বন্যার পর থেকে রেলপথ বন্ধ। সংস্কারকাজ শুরু হলেও কবে শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। মাটি ভরাট ছাড়া দৃশ্যমান বড় কোনো কাজ অনেক এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। ফলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলছে। তাঁর দাবি, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। ২১৭ কোটি টাকার প্রকল্প হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৯৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ৩০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ও পরবর্তী বাস্তবায়ন বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দেবেন।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প এলাকার প্রকৌশলী সজিবুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সব কাজ চলমান রয়েছে। ৫১ হাজার স্লিপার তৈরির কাজ চলছে। মাটির কাজও অব্যাহত আছে। আগামী মাসে ১০টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ছাতকের তিনটি রেলস্টেশন নির্মাণসহ প্রকল্পের অন্যান্য কাজও চলমান বলে জানান তিনি।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা কঠিন হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, মূলত বৃষ্টি ও বর্ষার কারণেই সময়মতো মাটির কাজ করা সম্ভব হয়নি। দেড় বছর মেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল পড়েছে। সব কাজ চলমান রয়েছে। তাঁদের হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাকি কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। আগের সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় অনেক মালামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বাকি কাজ শেষ করা এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির চেষ্টা চলছে। তাঁদের আশা, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যখন মাত্র এক-পঞ্চমাংশের মতো কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তখন ১৯৯ কোটি টাকার চুক্তিমূল্যের এই প্রকল্পের বাকি কাজ কত দিনে শেষ হবে এবং কবে সিলেট-ছাতক রেলপথে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হবে—এখন সেটিই স্থানীয় মানুষের প্রধান প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের বন্ধ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু না হলে ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
