শুক্রবার, ৭ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক পদে ৩০ কোটি, ডিসি হতে ৪৫ কোটি টাকার ‘ডিল’! শতকোটির গোপন চুক্তিতে উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে ঘিরে বিস্ফোরক অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগস্ট ৬, ২০২৬ ১১:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্বহস্তে লেখা সম্মতিপত্র, শত টাকার স্ট্যাম্প, কোটি টাকার চেক, স্ত্রী-বোনকে গ্যারান্টার—রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নজিরবিহীন আর্থিক চুক্তির অভিযোগে তোলপাড়। ফাইল ছবি

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম ও নজিরবিহীন অপব্যবহার, সরকারি চাকরি বিধিমালার তোয়াক্কা না করে সুদের শর্তে শত কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক চুক্তি, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেন এবং প্রভাবশালী লবিং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদ বাগানোর বিস্ময়কর অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভান্ডার বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) সালাহউদ্দিন আহমেদ।

একাধিক গণমাধ্যমের দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক স্বহস্তে লেখা ও স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্র, ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত চুক্তি, বিভিন্ন ব্যাংকের কোটি টাকার চেক, ব্ল্যাংক চেক, আত্মীয়স্বজনকে গ্যারান্টার করার নথি এবং আর্থিক সমঝোতার বিস্ময়কর দলিল। এসব নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে আসতে এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হতে তিনি শত কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে আলোচিত নথির মধ্যে রয়েছে ৭০ কোটি টাকা গ্রহণ করে ১৮ মাসে ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের সম্মতিপত্র, যেখানে নিজের স্ত্রী ও আপন বোনকে গ্যারান্টার হিসেবে যুক্ত করার তথ্যও মিলেছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমেদ বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা (আইডি: ১৬৫২১)। তিনি ১২ জুলাই ২০২৫ থেকে ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক হতে ৩০ কোটি টাকার চুক্তি

অনুসন্ধানে জানা যায়, মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকাকালেই তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (কন্ট্রোলার অব স্টোরস) পদে পদায়নের লক্ষ্যে একটি সুসংগঠিত লবিং পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজ হাতে স্বাক্ষর করে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে একটি সম্মতিপত্র সম্পাদন করেন। ওই দলিলে উল্লেখ করা হয়—

৩০ কোটি টাকা গ্রহণ করে ১৮ মাসের মধ্যে ৬৯ কোটি টাকা পরিশোধ করিব।

চুক্তিতে মূল অর্থের দ্বিগুণ এবং অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ যুক্ত করে মোট ৬৯ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার শর্ত উল্লেখ ছিল।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ওই ৩০ কোটি টাকা তিনি নগদ গ্রহণ করেন এবং তার বড় অংশ মন্ত্রণালয় পর্যায়ে লবিংয়ের কাজে ব্যয় করা হয়। পরে ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হলে ২৩ ডিসেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।

অভিযোগ রয়েছে, এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে বন্দরের কোটি কোটি টাকার ক্রয় ও ভান্ডার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

পরবর্তী লক্ষ্য—চট্টগ্রামের ডিসি পদ, ৪৫ কোটি টাকার নতুন সমঝোতা

চট্টগ্রাম বন্দরে যোগদানের পর সালাহউদ্দিন আহমেদের পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদ।

অনুসন্ধানী নথি অনুযায়ী, ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে তিনি আরও একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। সেখানে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে।

যদিও অর্থ বণ্টন নিয়ে মতবিরোধের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন সম্পন্ন হয়নি, তবে কোরবানির ঈদের পর অর্থ গ্রহণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

ওই সম্মতিপত্রে তিনি নিজের পরিচয় উল্লেখ করে একজন ব্যবসায়ীকে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের অনুমতি প্রদান করেন এবং জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানে সম্মতি জানান।

৭০ কোটি টাকার ঋণ, ১৪০ কোটি টাকা ফেরতের দলিল

অনুসন্ধানের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি স্বাক্ষরিত সম্মতিপত্র।

ওই দলিলে তিনি ৫০ কোটি টাকা ঋণ এবং ৪০ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ মোট ৭০ কোটি টাকা গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ১৮ মাসের মধ্যে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন।

দলিলে তিনি নিজের পূর্ণ পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ এবং চাকরির তথ্য উল্লেখ করে স্বাক্ষর করেন।

স্ত্রী ও বোন গ্যারান্টার, ব্ল্যাংক চেক জামানত

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে দলিল হস্তান্তরের সময় তিনি নিজের স্ত্রী লায়লা হাবিবা এবং আপন বোন জিনিয়াত খাতুনকে গ্যারান্টার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন।

একই সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে তিনটি ব্ল্যাংক চেক জামানত হিসেবে দেন।

ব্যাংকিং নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়—

. সিটি ব্যাংকের হিসাব থেকে ৬টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি টাকা।

. সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫টি চেকের মাধ্যমে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

. মোট ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর।

. অতিরিক্ত ৬টি ব্ল্যাংক চেক।

. আরও ২ কোটি টাকা মূল্যমানের দুটি জামানত চেক।

এছাড়া তিনটি ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবসায়িক কাজ সম্পন্ন হওয়ার দুই দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়ে কী বললেন সালাহউদ্দিন?

দৈনিক স্বাধীন কাগজ ও সমতল মাতৃভূমি’র একটি টিম অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে  সালাহউদ্দিন আহমেদের মুখোমুখি হলে তিনি বলেন—

আমি এই চেকগুলো লবিং এবং তদবিরের জন্য দিয়েছি। আসলে এসব দেওয়াটা আমার অন্যায় হয়েছে। আপনারা এসব প্রচার করবেন না। প্রচার করলে এতে আমার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে।

আইনজীবীর মতামত

ঢাকা হাইকোর্টের  সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বাদল ও সাখাওয়াত হোসেন গাজীর মতে, যদি এসব অভিযোগ ও নথির সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, দণ্ডবিধি, দুদক আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি, কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

জনপ্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মন্তব্য

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগে উল্লিখিত সম্মতিপত্র, ব্যাংক চেক ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সরকারি দায়িত্ব পালনের নীতি এবং প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তার মতে, একজন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব নথির সত্যতা এবং কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগ, নথি ও বক্তব্য অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ