রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জোছনা রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে ‘মলুয়া’ চাঁদের আলো, হাওরের জল আর লোকবাদ্যের সুরে ফিরে এলো বাংলার অমর লোকগাথা

ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জোছনা রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে ‘মলুয়া’। ফাইল ছবি

জোছনার রুপালি আলোয় ভেসে আছে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। নীরবতার বুক চিরে হঠাৎ ভেসে আসে ঢোল, বাঁশি ও নানা লোকবাদ্যের সুর। সেই সুরের সঙ্গে মিশে যায় লোকগানের টান, কথকের কণ্ঠ আর অভিনয়ের সংলাপ। কোথাও নেই প্রচলিত মঞ্চ, নেই চেনা কোনো প্রেক্ষাগৃহ—খোলা আকাশের নিচে টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশিই যেন হয়ে ওঠে এক অনন্য নাট্যমঞ্চ।

পূর্ণিমার এমন মায়াময় রাতে সেই জলমঞ্চেই মঞ্চায়িত হলো চন্দ্রাবতী রচিত বাংলার অমর লোকগাথা ‘মলুয়া’।

শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে ‘মলুয়া’ মঞ্চস্থ করে থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি। হাউস বোটে ব্যতিক্রমী এ আয়োজন করে উল্লাস ট্রাভেলস। হাওরের প্রকৃতি, জোছনার আলো ও জলরাশিকে নাটকের আবহের অংশ করে লোকগাথার পুরোনো আখ্যানকে নতুন এক পরিবেশনায় দর্শকের সামনে হাজির করা হয়।

গল্প, পালাগান, গান, কথকতা ও লোকনৃত্যের সমন্বয়ে সাজানো প্রযোজনাটিতে উঠে এসেছে প্রেম, সাহস, আত্মত্যাগ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই। চাঁদের আলোয় দুলতে থাকা হাওরের জল আর লোকবাদ্যের সুরে ‘মলুয়া’র গল্প যেন পেয়েছে এক ভিন্ন জীবন—যেখানে প্রকৃতি নিজেই হয়ে উঠেছে নাটকের নেপথ্যশিল্পী।

মৈমনসিংহ গীতিকার অমর পালা ‘মলুয়া’র ভাষ্যবয়ান ও নির্দেশনায় রয়েছেন সাইফুল জার্নাল। পুরোনো লোকগাথাকে নতুন সময়ের ভাষা ও দৃশ্যরীতিতে উপস্থাপনের পাশাপাশি লোকনাট্যের আদি আঙ্গিকের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা রয়েছে তাঁর ভাবনায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশে সেই ভাবনাই পেয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। চাঁদের আলো, হাওরের জল, নৌযানের দোলা আর লোকবাদ্যের সুর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকটির নিজস্ব আবহ।

নির্দেশক সাইফুল জার্নাল বলেন, ‘এই সময়ে মিউজিকের আদি ও প্রকৃত পারফরম্যান্সটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পালা, পুঁথি, গাজির গীত—যা একসময় ছিল বাংলার প্রাত্যহিক পালনের পরম্পরা, পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে এখন এর আয়োজন প্রায় শূন্য। আর যা-ও হয়, তা অপভ্রংশ। আমরা থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি সেই আদি লোক আঙ্গিকের মূল নির্যাসটুকু নিয়ে তা আধুনিক মঞ্চে পুনরায় সৃষ্টি করতে।

চন্দ্রাবতীর ‘মলুয়া’র কেন্দ্রে রয়েছে প্রেমের আখ্যান। তবে প্রেমের গণ্ডি পেরিয়ে এ কাহিনি ছুঁয়ে যায় সমাজের নানা বাস্তবতাকে। সামাজিক বৈষম্য, মর্যাদার প্রশ্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং প্রতিকূলতার মুখে মানুষের লড়াই—সবই এ লোকগাথার বিস্তৃত পরিসরে উপস্থিত।

বিশেষ করে মলুয়া চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নারীর দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার শক্তি। তিনি কেবল প্রেমিকা কিংবা স্ত্রী নন; লাঞ্ছনা, প্রতিকূলতা ও ক্ষমতাবানদের অত্যাচারের মধ্যেও সততা, মর্যাদা ও মানবিক শক্তি ধরে রাখা এক দৃঢ়চেতা নারী।

সেই পুরোনো আখ্যানই যখন টাঙ্গুয়ার হাওরের জোছনা রাতে নতুন পরিবেশে ফিরে আসে, তখন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে তৈরি হয় এক অন্যরকম সেতুবন্ধ। লোকগাথার গল্প যেমন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে, তেমনি তার ভেতরে থাকা প্রশ্নগুলোও সময় পেরিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করে। ‘মলুয়া’ তাই শুধু একটি প্রেমের গল্প হয়ে থাকেনি; নারীর মর্যাদা, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থানের মতো বিষয়ও নতুন করে সামনে এনেছে।

উল্লাস ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী হাসানুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছি মাটির ও শিকড়ের সংস্কৃতিকে ধারণ করে পূর্ণিমা রাতে এই আয়োজনটা করতে। পর্যটক হিসেবে যারা হাওরে ঘুরতে আসেন, তাদের জন্য বিনোদনের নানা রকম ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু আমরা এবার মাটির সুরে নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছি। আমাদের দেশীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে ধারণ করে আনন্দ উদযাপন করেছি। সম্ভবত এই প্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউস বোটে কোনো থিয়েটার প্রদর্শনী হলো।

‘মলুয়া’ প্রযোজনায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন হাসনাত রিপন, নুসরাত ইরা, সাইদুর শাহীন, শাহরিয়ার সজীব, প্রিয়ম মজুমদার, তাহাদিল আহমেদ, হুমায়রা স্নিগ্ধা, গোপী দেবনাথ, ফরহাদ শামীম, মারিয়া ইয়াসমিন, পারভীন সুলতানা কলি, তন্দ্রা হাই, ধ্রুব, পি কে ফজল, সানজিদা চৌধুরী অরিন, উম্মে প্রেমা প্রমুখ।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জলমঞ্চ পেরিয়ে এবার ‘মলুয়া’ যাবে চুনারুঘাটে। চুনারুঘাট সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের ৩৭ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষে আগামী ২ অক্টোবর চুনারুঘাটে নাটকটির আরেকটি প্রদর্শনী হওয়ার কথা রয়েছে।

জোছনা রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে ‘মলুয়া’র এই আয়োজন যেন শুধু একটি নাট্যপ্রদর্শনী নয়—বাংলার লোকঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষের গল্পকে একই সুতোয় বেঁধে দেওয়ার এক নান্দনিক প্রয়াস। জলরাশির ওপর ভেসে থাকা সেই রাতের মঞ্চে তাই পুরোনো লোকগাথার সঙ্গে নতুন করে কথা বলেছে চাঁদ, হাওর আর বাংলার মাটির সুর।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।