চট্টগ্রামে ২০০ কোটি টাকার ২০ তলা কর ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে তোলপাড়, প্রথম দফার টেন্ডার বাতিলের পর দ্বিতীয় দফায় যৌথ উদ্যোগের আড়ালে এনডিইর অংশগ্রহণের অভিযোগ। ফাইল ছবি
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া ২০ তলা দৃষ্টিনন্দন কর ভবন প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগে বিতর্কিত এবং বর্তমানে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) এবার ভিন্ন কৌশলে এই মেগা প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে—সরকারি বিধিবিধান ও কালো তালিকাভুক্তির বিষয়টি পাশ কাটিয়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চুক্তির মাধ্যমে দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ভূমিকা। পুরো প্রক্রিয়ায় গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে। বিশেষ করে পাঁচজন প্রকৌশলীর ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪ গত ১২ মে তিনটি বেজমেন্টসহ ২০ তলা কর ভবন নির্মাণের জন্য প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্রের আইডি নম্বর ১৩২২৪১৩। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত টেন্ডার ক্যাপাসিটি বা আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও এনডিই ওই দরপত্রে কাজ পাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এনডিইকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে শেষ মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য সামনে আসার পর মন্ত্রণালয় প্রথম দফার দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেয়।
কিন্তু প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হলেও থেমে থাকেনি এনডিইর তৎপরতা। গত ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪ দ্বিতীয় দফায় একই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে। এবার সরাসরি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনি ও যোগ্যতাসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে নতুন কৌশল নেয় প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান খোকন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (কেসিইএল) সঙ্গে বিশেষ জয়েন্ট ভেঞ্চার এগ্রিমেন্ট বা যৌথ উদ্যোগের চুক্তি করে ‘কেসিইএল-জেভি’ নামে দরপত্র প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় এনডিই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যৌথ উদ্যোগের আড়ালে কার্যত এনডিইর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রভাবিত করে কেসিইএল-জেভিকে বিজয়ী করার সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার যৌথ উদ্যোগের মূল চুক্তিপত্র এবং দরপত্রে দাখিল করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত অংশীদারত্ব, দায়িত্ব বণ্টন ও যোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথম দফার দরপত্রে অযোগ্যতা ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দ্বিতীয় দফায়ও একই প্রতিষ্ঠানকে পরোক্ষভাবে যুক্ত করার বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) একটি প্রকল্পে এনডিই দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে, কিংবা যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সেই বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কালো তালিকাভুক্তির আদেশের কার্যকারিতা, পরিধি এবং দরপত্রে অংশগ্রহণের ওপর এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে এনডিই হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়েছে। বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ ও একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাজের মান, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রকল্প সম্পন্ন করার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডেসকোর একটি কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারার অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্তত পাঁচটি সরকারি দপ্তরের অসাধু প্রকৌশলীকে প্রভাবিত করে কালো তালিকাভুক্ত অবস্থাতেই শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনডিইর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে চলমান দরপত্র প্রক্রিয়াও বাতিল করা হতে পারে। বর্তমান সরকারের সময়ে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় বদ্ধপরিকর বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সাধারণ ঠিকাদার ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক লবিং ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ফলে যোগ্য ও সৎ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে শুধু সরকারি অর্থের ঝুঁকিই বাড়ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকল্পের স্বচ্ছতা, গুণগত মান ও জনস্বার্থ।
তাঁরা অবিলম্বে আগ্রাবাদের ২০০ কোটি টাকার কর ভবন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া, এনডিই ও কেসিইএলের যৌথ উদ্যোগের চুক্তি, কালো তালিকাভুক্তির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
পাঁচ প্রকৌশলীকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এনডিই কীভাবে নতুন করে সরকারি মেগা প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে? যৌথ উদ্যোগের চুক্তির আড়ালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? কারা এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছেন? পাঁচজন প্রকৌশলীর ভূমিকা কী এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তি কতটুকু?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দরপত্রের নথি, যৌথ উদ্যোগের চুক্তিপত্র, কালো তালিকাভুক্তির আদেশ এবং মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশপত্রের বিস্তারিত পর্যালোচনা জরুরি।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোন পাঁচজন প্রকৌশলীর ভূমিকার মাধ্যমে এনডিই এই প্রকল্পের কাজ পাওয়ার সুপারিশ পেয়েছে, তাঁদের পরিচয়, দায়িত্ব এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আরও তথ্য-প্রমাণ সামনে আনা হবে। প্রকল্পের প্রায় ২০০ কোটি টাকার সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং দরপত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
