দুই মাস আগে ভোলা থেকে প্রত্যাহার, বিভাগীয় তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তির আদেশ—এরপরও একই শাখায় ফের সংযুক্তি; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ছবি: সংগৃহীত
দুর্নীতির অভিযোগে বদলি ও বিভাগীয় শাস্তির আদেশের পরও যেন থামানো যাচ্ছে না সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহর ভোলার ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় ফিরে আসার পথ। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে আবারও ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই শাখায় তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারকে ম্যানেজ করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি পুনরায় ভোলার এলএ শাখায় যোগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রোববার (৮ নভেম্বর) তিনি আবারও এই শাখায় যোগদান করেন। এ ঘটনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও এর নেপথ্যের উদ্দেশ্য নিয়ে ভোলাজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহর মূল কর্মস্থল ছিল পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা ভূমি অফিসে। সেখানে কর্মরত থাকাকালে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ৫১ জন স্বচ্ছল ব্যক্তিকে খাসজমি বন্দোবস্ত পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের শাখা-৩ থেকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (নম্বর-১১/২০২৫) রুজু করা হয়। এরপর তাকে কাউখালী থেকে সরিয়ে ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সংযুক্ত করা হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ভোলায় এসেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অবসান হয়নি। বরং ভোলার ভূমি অধিগ্রহণ শাখাকে ঘিরে নতুন করে নানা বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। আসাদুল্যাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও কাউখালীর দুর্নীতিসংক্রান্ত ফাইলের অগ্রগতি নিয়েও ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে জেলার বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে ঘুষ-বাণিজ্যের একটি চক্র গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব ভূমিমালিক আসাদুল্যাহর চাহিদামতো অর্থ দিতে পারেন, তাদের অধিগ্রহণসংক্রান্ত ফাইলের কার্যক্রম এগিয়ে যায়। আর যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের লাখ টাকা মূল্যমানের জমির বিপরীতে নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে ভ্যালুয়েশন প্রস্তুত করার অভিযোগ রয়েছে।
এমন অভিযোগের কারণে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে গিয়ে বহু পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের ভাষ্য, ভূমি অধিগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও হয়রানির কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভোলার বিভিন্ন জনপদে এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
তথ্যমতে, বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভোলা জেলাজুড়ে শত শত একর জমি অধিগ্রহণের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কারসাজির মাধ্যমে সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করেন। ঢাকায় তার আলিশান বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট ও শত একর জমিসহ বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। সরকারি একজন সার্ভেয়ারের আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। এসব সম্পদের উৎস ও অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সচেতন মহল।
এদিকে সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে পরিচালিত বিভাগীয় তদন্তে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত সচিব নাসরিন জাহানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে চলতি বছরের (২০২৬) ২ আগস্ট তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর তাকে ভোলা থেকে প্রত্যাহার করে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্তির মাত্র দুই মাসের মাথায় তাকে আবারও ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সেই ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যে শাখাকে ঘিরে তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেই একই শাখায় পুনরায় সংযুক্তির সিদ্ধান্তের কারণ কী—এ প্রশ্ন এখন ভোলার প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতিবাজরা যেখানেই যাক, তারা তাদের স্বভাবগত অপরাধ থেকে সরে আসে না।
একজন বিভাগীয় তদন্তে দোষী সাব্যস্ত কর্মকর্তা ও শাস্তির আদেশপ্রাপ্ত সার্ভেয়ারকে কেন বারবার ভোলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সংযুক্ত করা হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—কোন বিবেচনায় এবং কার স্বার্থে বারবার সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহকে ভোলার এলএ শাখায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে? তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিভাগীয় তদন্তের বিষয়টি কি পুনরায় সংযুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?
ভুক্তভোগীদের অনেকেই বলছেন, একজন বিভাগীয় তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তির আদেশপ্রাপ্ত সার্ভেয়ারকে আবারও একই কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বিষয়টি ইতোমধ্যে ভোলার টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে ভোলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতা এবং দায়সারা বদলি বা সংযুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে সার্ভেয়ার আসাদুল্যাহর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার।
