মঙ্গলবার, ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এনবিআরের সহিদুলের ‘সম্পদের সাম্রাজ্য’: ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট, শত কোটি টাকার ভবন, মোট সম্পদ ৪০০ কোটিরও বেশি!

আবদুর রহমান
জুন ১, ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিজীবনের হিসাব অনুযায়ী যার আজীবন আয় হওয়ার কথা কয়েক কোটি টাকার বেশি নয়। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিস্ময়কর এক সম্পদ সাম্রাজ্যের চিত্র। ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে পূর্বাচল, সাভার, গাজীপুর—সবখানেই ছড়িয়ে রয়েছে তার বিপুল সম্পত্তি।

এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলামের নামে, তার স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের নামে পাওয়া গেছে অন্তত ৫৩টি ফ্ল্যাট, একাধিক বহুতল ভবন, ২০টির বেশি প্লট, দোকানপাট এবং শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে সম্পদের বাজারমূল্য ৪০০ কোটি টাকারও বেশি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বসুন্ধরায় ‘শেল কবিতা’: শত কোটি টাকার ভবন

রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে দাঁড়িয়ে আছে ১০ তলা বিশিষ্ট ‘শেল কবিতা’ নামের একটি ভবন। পুরো ভবনের মালিক সহিদুল দম্পতি। প্রতি তলায় দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাট।

রিয়েল এস্টেট সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ভবনটির ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই প্রায় ১০০ কোটি টাকা। জমির মূল্য যোগ করলে অঙ্কটি আরও অনেক বড়।

রাজধানীজুড়ে আরও ৩৩ ফ্ল্যাট

বসুন্ধরার বাইরে বাংলামোটর, ইস্কাটন, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সহিদুল, তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ও আত্মীয়দের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে তার নামে দুটি ফ্ল্যাট, ইস্কাটনের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট এবং মিরপুর রূপনগরে একটি ছয়তলা ভবনে রয়েছে ১০টি ফ্ল্যাট।

শুধু এসব ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যই কয়েক দশ কোটি টাকা।

মিরপুরে ভবন, কারখানা ও কোটি কোটি টাকার জমি

মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে স্ত্রীর নামে নির্মিত আরেকটি ছয়তলা ভবনে রয়েছে ২০টি ফ্ল্যাট। পরবর্তীতে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়।

এছাড়া আগুন্দা মৌজায় প্লাস্টিক কারখানার জন্য ভাড়া দেওয়া প্লট এবং গড়ানচটবাড়ি এলাকায় ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে ৫৩টি ফ্ল্যাট ও দুটি দোকানের বাজারমূল্যই প্রায় ১৬২ কোটি টাকা।

নিউমার্কেট ও আজিজ সুপার মার্কেটে দোকান

শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে একটি দোকান এবং নিউমার্কেটে আরেকটি দোকানের মালিক সহিদুল ইসলাম। দুটি দোকানের সম্মিলিত বাজারমূল্য ৪ কোটিরও বেশি।

সাভারে ‘সেজুতি’ বাংলো: রহস্যময় প্রাসাদ

সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ৩৫ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ‘সেজুতি’ নামের একটি বিলাসবহুল বাংলোবাড়ি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঝে মধ্যে দামি গাড়ির বহর এলেও বাড়িটির ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে কেউ তেমন কিছু জানেন না। শুধু জমির মূল্যই প্রায় ১০ কোটি টাকা।

মধুমতিতে আরও ৯০ কোটির জমি

মধুমতি মডেল টাউনেই সহিদুলের মালিকানায় রয়েছে পাঁচটি বড় প্লট। কোথাও গ্যারেজ, কোথাও গবাদিপশুর খামার, আবার কোথাও ভারী যন্ত্রপাতির ওয়ার্কশপ।

৩২০ কাঠা আয়তনের এসব প্লটের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা।

পূর্বাচলে ৬২ কোটি টাকার ছয় প্লট

পূর্বাচলের বিভিন্ন মৌজায় সহিদুল ও তার স্ত্রীর নামে ছয়টি জমির কাগজপত্র পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব জমির সম্মিলিত মূল্য ৬২ কোটিরও বেশি।

গাজীপুরের কালীগঞ্জেও তার নামে রয়েছে আরও একটি মূল্যবান জমি।

শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ

স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি অস্থাবর সম্পদেও রয়েছে বড় বিনিয়োগ।

স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে থাকা একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাবেও রয়েছে নগদ অর্থ।

ছেলের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

সহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহানের নামে বসুন্ধরার জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে অফিস নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ব্যবসা পরিচালনার জন্য অন্তত ৫ কোটি টাকা সহিদুল ইসলাম সরবরাহ করেছেন।

সরকারি চাকরির আয়ে কি সম্ভব?

সহিদুল ইসলামের সহকর্মী ও কাস্টমস ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ চাকরি জীবনে একজন কর্মকর্তার মোট আয়, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সর্বোচ্চ কয়েক কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, পারিবারিক ব্যয় বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকার মতো সঞ্চয় সম্ভব।

কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদের পরিমাণ সেই হিসাবের অন্তত শতগুণ বেশি।

প্রশ্নের মুখে সম্পদের উৎস

কর্মজীবনে সহিদুল ইসলাম এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী পদে দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

সম্পত্তির অধিকাংশই ২০১০ সালের পর অর্জিত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তাহলে প্রশ্ন একটাই—সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের বাইরে শত শত কোটি টাকার উৎস কোথায়?

কথা বলতে রাজি নন সহিদুল দম্পতি

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি সহিদুল ইসলাম। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন শুনেই তিনি ফোন কেটে দেন।

বসুন্ধরার ‘শেল কবিতা’ ভবনে গিয়ে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

টিআইবির প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি তদন্ত করবে?

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,

এই বিপুল সম্পদের উৎস কী, তা রাষ্ট্রের অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তার মতে, এ ধরনের অভিযোগে রাষ্ট্র যদি কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

সমতল মাতৃভূমির মন্তব্য

জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা যদি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়—রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও বড় প্রশ্ন। অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থার। তবে এত বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর নীরবতা জনমনে আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে। স্বচ্ছ তদন্তই পারে সত্য উদঘাটন করতে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।