রাজধানীর মানব পাচার ও অভিবাসী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা প্রায় চার মাস ধরে বিচারকশূন্য থাকায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বিচারিক কার্যক্রম। বিচারক না থাকায় নতুন মামলা গ্রহণ, নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ শুনানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিগত মার্চ মাস থেকে ট্রাইব্যুনালটিতে বিচারক পদে দায়িত্ব প্রদান করা হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরা এখনো আদালতে যোগদান করেননি। এর ফলে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে রয়েছে। বর্তমানে শুধুমাত্র বদলি কোর্টের মাধ্যমে জামিন শুনানি ও নিয়মিত হাজিরার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, নতুন মামলা দায়ের করতে এসে ফিরে যাচ্ছেন আইনজীবীরা। অন্যদিকে, বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে এলেও বিচারক না থাকায় খালি হাতেই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার বলেন, আমি বিগত চার মাস ধরে পাঁচটি মামলা নিয়ে আদালতে এসে ফিরে যাচ্ছি। আদালতের অধীনস্থ কর্মচারীরা জানান, আমাদের কোর্টের স্যার চার মাস ধরে আদালতে বসছেন না। আইন মন্ত্রণালয়ের আদেশ এবং জেলা জজের নির্দেশনা থাকলেও তিনি কেন যোগদান করছেন না, সেটি আমাদের জানা নেই। ফলে পুরোনো মামলার জট যেমন বাড়ছে, তেমনি নতুন মামলার কার্যক্রমও সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিচারপ্রার্থী রায়হান বলেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে আমার ছোট ভাইকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। তারা লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিমানে উঠিয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবর পাইনি। কোথায় আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না—কিছুই জানি না।
এভাবেই প্রতিনিয়ত মানব পাচারের শিকার পরিবারের সদস্যরা স্বজনদের সন্ধান ও প্রতারকদের বিচারের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হলেও বিচারক না থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
বাড্ডার বাসিন্দা রহিমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য একটি এজেন্সিকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি। সংসারের অভাব দূর হবে—এই আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। ওমান যাওয়ার জন্য বিমানে উঠলেও পাঁচ-ছয় মাস ধরে তার কোনো যোগাযোগ নেই। আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে—আমি কিছুই জানি না। দালালকে ফোন করলে উল্টো আমাকে ধমক দেয়। প্রতিদিন ছেলের ছবি বুকে নিয়ে ঘুমাই।
এ বিষয়ে মানব পাচার ও অভিবাসী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামালের সঙ্গে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই কোর্টে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে স্যার এখনো যোগদান করেননি। আশা করছি, খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে এবং আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিচারক না থাকায় মানব পাচার ও অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এতে একদিকে যেমন মামলার জট বাড়ছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
ভুক্তভোগী পরিবার, আইনজীবী ও সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা মানব পাচার ও অভিবাসী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকার বিচারক সংকট দ্রুত নিরসনে মাননীয় আইন মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে বিচারক যোগদানের ব্যবস্থা করে আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম চালু করা হোক, যাতে মানব পাচারের শিকার মানুষ ও তাদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।
