স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি সম্পত্তি দখল থেকে ব্যাংক কেলেঙ্কারি—একাধিক সংস্থার অনুসন্ধানে আলোচনায় সাবেক এমপি। ছবি সংগৃহীত
এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সাবেক সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং খুলনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার ও পরিবারের সম্পদ, ব্যবসা এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গুলশানের সরকারি ২৭ কাঠার প্লট দখলের অভিযোগ, আদালতে বিচার শুরু
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার গুলশান-২ এলাকার ১০৪ নম্বর সড়কের সিইএন (ডি)-২৭ নম্বর প্লট, যা খ-তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত সরকারি সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত, সেটির মালিকানা জাল নথির মাধ্যমে দখল করা হয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের তদন্তে অভিযোগ করা হয়, মূল নকশায় ১০৪ নম্বর সড়কের তথ্য পরিবর্তন করে ১০৩ নম্বর সড়ক দেখানো হয় এবং মালেকা রহমান নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষর জাল করে ১৯৯৭ সালে সালাম মুর্শেদী ও ইফফাত হকের নামে প্লটটির নামজারি করা হয়। সিআইডির তদন্তে ওই স্বাক্ষর ভুয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুরুতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাকে মামলার আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শেষে তাকে অভিযুক্ত করে মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ চার্জশিট গ্রহণ করে বিচার কার্যক্রম ও স্বাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করেছে।
২২ কোটি টাকার আয়কর ফাঁকির অভিযোগ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে প্রায় ২২ কোটি টাকার আয়কর ফাঁকির অভিযোগ উঠে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনুসন্ধানের পর তিনি এর একটি অংশ হিসেবে ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। তবে বাকি অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এনবিআর তার ব্যাংক হিসাব জব্দ (ফ্রিজ) করে। একই সঙ্গে তার স্ত্রী শারমিন সালাম, ছেলে ইশমাম সালাম, মেয়ে শেহরিন সালাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়কর নথিও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও তিন হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আড়ালে ৪৩টি কথিত ভুয়া তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আদালত প্রিমিয়ার ব্যাংকের চার কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অভিযোগ রয়েছে, সালাম মুর্শেদী ও তার মেয়ে শেহরিন সালামের এই ঘটনায় সম্পৃক্ততা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
পুরো পরিবারের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের অনুসন্ধান
দুদকের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেশের ৭৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে সালাম মুর্শেদী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে থাকা সব ধরনের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তার নির্ভরশীলদের সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় সেই সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। একই হলফনামায় সালাম মুর্শেদীর নিজস্ব সম্পদ ১৩৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর সম্পদ ১৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরার ‘সিয়াম টাওয়ার’ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ
রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত সালাম মুর্শেদীর মালিকানাধীন ১৫ তলা সিয়াম টাওয়ার নির্মাণেও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটি সিভিল এভিয়েশনের নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে প্রায় ৯.৭৬ মিটার বেশি উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী চারপাশে নির্ধারিত খালি জায়গা না রেখে পুরো জমিতে ভবন নির্মাণ, অনুমোদিত নকশায় অফিস হিসেবে থাকা টপ ফ্লোরে বাণিজ্যিক রেস্টুরেন্ট পরিচালনা এবং দীর্ঘদিন ফায়ার সার্ভিসের নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে ২০০৮ সাল থেকে বাফুফের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট, অর্থ কমিটি এবং রেফারিজ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফিফার অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা তাকে ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি বাফুফের সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে, সালাম মুর্শেদী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিভিন্ন অংশ বর্তমানে দুদক, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুসন্ধান বা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে এসব বিষয় আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
