বজ্রপাতে কৃষক বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে কুলসুম। তাঁকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টায় বড় ভাই বাবন প্রামাণিক। তাঁর চোখজুড়েও কান্না। সোমবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রবেশপথে। ছবি: মুনসী লিটন
বিকেল থেকেই আকাশজুড়ে জমেছিল কালো মেঘ। দূরে দূরে গর্জন করছিল বজ্রধ্বনি। ঠিক তখনই জমিতে কেটে রাখা ধানের আঁটির কথা মনে পড়ে কৃষক হজরত আলী প্রামাণিকের। সংসারের শেষ সম্বল যেন বৃষ্টিতে নষ্ট না হয়, সেই চিন্তায় ছুটে যান মাঠে। কিন্তু কে জানত, ধান বাঁচাতে যাওয়া সেই মানুষটিই আর জীবিত ফিরবেন না!
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার জয়ন্তী হাজরা গ্রামে ধানের আঁটি স্তূপ করে জড়ো করার সময় ভয়াবহ বজ্রপাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হজরত আলী। চারদিকে তখন ঝড়-বৃষ্টি আর গগনবিদারী বজ্রপাতের তাণ্ডব। পরিবারের স্বপ্ন বাঁচাতে গিয়ে মুহূর্তেই থেমে যায় এক কৃষকের জীবনযুদ্ধ।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনেরা তাঁকে দ্রুত ভ্যানে করে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরের খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত হজরত আলী প্রামাণিক জয়ন্তী হাজরা গ্রামের মৃত আক্কেল আলী প্রামাণিকের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ছুটে আসে পরিবারের সদস্যরা। আর সেখানেই হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের জন্ম হয়।
ভ্যানের ওপর বসে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে ছয় বছরের ছোট্ট কুলসুম। শিশুটি বুঝে গেছে—তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। পাশে দাঁড়িয়ে বড় ভাই, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র বাবন প্রামাণিক, চোখভরা অশ্রু নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আকুতি জানাচ্ছিল—
“আল্লাহ! আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও…”
নিহতের ভাতিজা বাপ্পী জানান, বিকেলে মেঘ দেখে ধানের আঁটি গুছিয়ে রাখতে মাঠে যান তাঁর চাচা। হঠাৎ শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাত। কিছুক্ষণ পর তাঁকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে বজ্রপাতে আহত হয়েছেন আরও তিনজন।
তারা হলেন—শিমুলিয়া ইউনিয়নের কালিশংকপুর এলাকার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী অন্তরা (১০), বিলজানি গ্রামের গৃহবধূ ডলি খাতুন (২০) এবং হলুদবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ সমা পারভিন (২৫)। বর্তমানে তারা খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শারমিন আকতার রিমা জানান, বজ্রপাতে আহত কৃষককে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অন্য আহতদের চিকিৎসা চলছে।
জয়ন্তী হাজরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সকিব খান টিপু বলেন, “হজরত আলী অত্যন্ত সহজ-সরল ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
