গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন তেজগাঁও এলেনবাড়ি সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, সংস্কার ও মেরামত কাজের নামে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত সচিব অবায়দুর রহমানের নাম ও প্রভাবের দোহাই দিয়ে তিনি কার্যত ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করেছেন।
একাধিক সূত্রের দাবি, তেজগাঁও এলেনবাড়ি সম্পদ বিভাগে যোগদানের পর থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলামের নেতৃত্বে কথিত ‘কমিশন বাণিজ্য’ জমজমাট হয়ে উঠেছে। তাঁর মনোনীত ঠিকাদার ছাড়া কার্যাদেশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সাধারণ ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সংস্কার ও মেরামত কাজের প্রাক্কলন অতিরিক্ত দেখিয়ে কাজের বিপরীতে বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে লোপাট করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, এসব কর্মকাণ্ডের স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নবথিয়েটারের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ ঘিরে প্রশ্ন
একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপি সরকারের প্রধান জনাব তারেক রহমানের তেজগাঁও নবথিয়েটার পরিদর্শন ও আগমন উপলক্ষে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কয়েকটি প্যাকেজে কাজ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তাঁর মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লীজা এন্টারপ্রাইজকে ১৭ লাখ টাকা করে তিনটি প্যাকেজে মোট প্রায় ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব কাজের বিপরীতে অগ্রিম ১০ শতাংশ হারে কমিশন নেওয়া এবং নামমাত্র মূল্যে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন করার একটি প্রক্রিয়া চলছে। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুধু নবথিয়েটার নয়, তেজগাঁও বিজ্ঞান জাদুঘরের সাজসজ্জা, মেরামত ও সংস্কার কাজেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলীর মনোনীত ঠিকাদারদের মাধ্যমে নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
খামারবাড়ির তুলা ভবনেও ‘কাগজে সংস্কার’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন খামারবাড়ির তুলা ভবনের মেরামত ও সংস্কার কাজের প্রাক্কলনেও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখিয়ে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। পরে কাজের পরিমাণ ও মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, কিছু আনুষঙ্গিক কাজের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র আরও ভিন্ন। কাগজে-কলমে সংস্কার ও মেরামতের কাজ দেখানো হলেও সরেজমিনে গিয়ে অনেক কাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে বরাদ্দের অর্থের বড় অংশ ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
ট্রেনিং একাডেমির কাজেও অতিরিক্ত প্রাক্কলনের অভিযোগ
সম্পদ বিভাগের অধীন ট্রেনিং একাডেমির মেরামত, সংস্কার ও কেনাকাটার কাজ নিয়েও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। সূত্রগুলোর দাবি, এসব কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রাক্কলন তৈরি করে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। পরে বাস্তবে কাজের পরিমাণ ও মানের সঙ্গে কাগজপত্রের হিসাবের মিল পাওয়া যায় না।
এভাবে একের পর এক সংস্কার ও মেরামত কাজকে ঘিরে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এমন অভিযোগ সাধারণ ঠিকাদার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেজগাঁও সম্পদ বিভাগের বিভিন্ন কাজে অতি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত মানের কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাজের মান যাচাই, পরিমাপ ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি না থাকায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে একই কাজ বারবার সংস্কার করার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে এবং এতে সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
আগেও অভিযোগ, প্রকাশিত সংবাদ—তবু ব্যবস্থা কোথায়?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশ পেলেও কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করার কারণেই এসব অভিযোগ বারবার ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগগুলো সঠিক হলে সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে কাজ—ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাধারণ ঠিকাদার বলেন, বিশেষ সুবিধা না দিলে অনেক কাজের কার্যাদেশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ এবং বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
একজন ঠিকাদার বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্কার ও মেরামত কাজের প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার এবং বাস্তব কাজ সরেজমিনে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তদন্তের দাবি, বহাল তবিয়তে শফিউল
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—এত অভিযোগের পরও গণপূর্ত অধিদপ্তরের তেজগাঁও সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল ইসলাম কীভাবে এখনও বহাল রয়েছেন?
তাদের দাবি, অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, বরং নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের কাজ যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্ত করা হোক। তাহলেই সরকারি অর্থের অপচয়, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল ইসলামের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব অবায়দুর রহমানের নাম ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম অনিয়ম করছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি অর্থের সুরক্ষা, প্রকল্পের মান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
