বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফুটপাতে আর ‘চাঁদার রাজত্ব’ নয়! স্মার্টকার্ডে বৈধ হকার, মাসিক ফিতে রাজধানীতে বসবে নিয়ন্ত্রিত ‘স্ট্রিট মার্কেট’

নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ১৪, ২০২৬ ১:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হকারদের বসার নির্ধারিত স্থানে দাগ টেনে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা থেকে তোলা ছবি : সমতল মাতৃভূমি

রাজধানীর ফুটপাতজুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলা চাঁদাবাজি, দখল আর বিশৃঙ্খলার অধ্যায়ে এবার আসতে যাচ্ছে বড় পরিবর্তন। প্রতিদিনের ১০০-২০০ টাকার অবৈধ চাঁদা নয়, বরং সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্বল্প ফি দিয়েই বৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারবেন হকাররা। মাসে মাত্র ১০০ টাকা কিংবা বছরে এক হাজার টাকার বিনিময়ে নিবন্ধিত হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সদ্য অনুমোদিত হকার নীতিমালাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ফুটপাত বাণিজ্যকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা
মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যৌথভাবে তৈরি করছে নিবন্ধিত হকারদের তালিকা। নিবন্ধনের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে আধুনিক স্মার্টকার্ড, যেখানে থাকবে কিউআর কোডসহ ব্যবসায়ীর পরিচয়, ব্যবসার ধরন, নির্ধারিত স্থান, সময় এবং অন্যান্য তথ্য।

ইতোমধ্যে তিনশ হকারের হাতে পৌঁছে গেছে এই স্মার্টকার্ড। গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও মিরপুর-১০ এলাকাসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কোথায় কোথায় হকার বসতে পারবেন, সেই স্থান নির্ধারণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

ফুটপাত থাকবে পথচারীরও, হকারেরও

নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পথচারীদের চলাচলে। কোনো অবস্থাতেই পুরো ফুটপাত দখল করা যাবে না। হকার বসার পরও কমপক্ষে ৫ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত না হয়।

একই সঙ্গে যানজট এড়াতে মেট্রোস্টেশন, বাস টার্মিনাল, বড় মোড় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের অন্তত ৩০ ফুট দূরে বসতে হবে হকারদের। রাজধানীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অফিস শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসার অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চালু হতে পারে বিশেষ ‘হলিডে মার্কেট’।

তবে খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়, কবরস্থান কিংবা গণপরিসরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না। স্থায়ী দোকান বা অবকাঠামো নির্মাণও নিষিদ্ধ থাকবে। শুধুমাত্র ছাতা বা অস্থায়ী আচ্ছাদন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

স্মার্টকার্ডে নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম ভাঙলেই বাতিল লাইসেন্স
নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, হকার হতে হলে বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। একটি পরিবার থেকে একজনের বেশি ব্যক্তি নিবন্ধিত হতে পারবেন না। ব্যবসা করার সময় স্মার্টকার্ড বা পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক। যার জন্য যে স্থান নির্ধারিত থাকবে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ সেখানে বসতে পারবেন না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—নিয়ম লঙ্ঘন করলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের ‘যার শক্তি তার ফুটপাত’ সংস্কৃতির জায়গায় এবার আসছে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা।

এছাড়া নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য রাখা হয়েছে ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা, যা সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চাঁদাবাজির কোটি টাকার সাম্রাজ্যে ধাক্কা?

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। রাজধানীর প্রায় পাঁচ লাখ হকারের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিদিন একজন হকারকে গড়ে ১৯২ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল অর্থের ভাগ যায় বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক কর্মী ও অসাধু চক্রের হাতে।

নতুন নীতিমালাকে তাই অনেকে দেখছেন চাঁদাবাজির সেই অদৃশ্য সাম্রাজ্যে বড় আঘাত হিসেবে। কারণ, এখন থেকে হকারদের দেওয়া অর্থ সরাসরি সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা হবে এবং তা ব্যয় করা হবে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নির্ধারিত এলাকার উন্নয়নে।

তবু আশঙ্কা কাটছে না হকারদের

তবে এই উদ্যোগ ঘিরে হকারদের একাংশের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগও। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎের মতে, বর্তমান পরিকল্পনায় হয়তো মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হকার বৈধভাবে বসার সুযোগ পাবেন। বাকিরা উচ্ছেদের মুখে পড়বেন।

তিনি বলেন, যাদের তালিকায় রাখা হচ্ছে না, তারা কোথায় যাবে? এভাবে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হবে না। বরং হকার ও পথচারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাফিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই তালিকা ও স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে। তবে বাস্তবতার কারণে সব হকারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব নাও হতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

রাজধানীর ফুটপাতে নতুন যুগের সূচনা?

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর ফুটপাত মানেই ছিল দখল, বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি আর পথচারীদের দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। এবার সেই ফুটপাতেই আসছে স্মার্টকার্ড, কিউআর কোড আর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার নতুন অধ্যায়।
এখন দেখার বিষয়—এই উদ্যোগ সত্যিই কি রাজধানীর ফুটপাতকে শৃঙ্খলার পথে নিয়ে যেতে পারে, নাকি পুরোনো চাঁদাবাজির অদৃশ্য সিন্ডিকেট আবারও নতুন রূপে ফিরে আসে কিনা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।