রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভবনের দেয়াল যেন আজ নিঃশব্দে কাঁদছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলার আড়ালে, ক্ষমতার দম্ভে মোড়া এক অদৃশ্য রাজত্ব—যেখানে মানবিকতা হারিয়েছে তার শেষ আশ্রয়, আর ‘টর্চার সেল’ নামের এক ভয়ের ছায়া ঢেকে ফেলেছে কর্মচারীদের দৈনন্দিন জীবন।
নির্যাতনের গল্প—যেখানে চিৎকারও বন্দিদশা কাটাতে হয়।
গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬, সকাল দশটার শান্ত আলো হঠাৎই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। লিফট অপারেটর মিজানুর রহমানকে ‘জরুরি কথা’র ছলে ডেকে নেওয়া হয় নিচতলার সেই কুখ্যাত ঘরে। সেখানে অপেক্ষা করছিল ক্ষমতার নেশায় বুঁদ কয়েকজন—শফিকুল ইসলাম, গোলাম আক্তার ও তাদের সঙ্গীরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, কথা নয়—শুরু হয় গালিগালাজ, তারপর হিংস্র আক্রমণ। তবে মিজানুরের ভাষায়— আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে… যেন মানুষ না, প্রশিক্ষত শিকার! তার আর্তচিৎকার ভেঙে দেয় নীরবতা, কিন্তু সেই চিৎকারে লুকিয়ে থাকে ভয়—চাকরি হারানোর ভয়, বদলির ভয়, বেঁচে থাকার ভয়।
নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি—একটি নীরব ইতিহাস- এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আজিজুল, মজিবুর, নুরুল, আক্কাস—নামের তালিকা দীর্ঘ, কিন্তু তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ।
প্রতিটি নাম যেন এক একটি চাপা কান্না, এক একটি না বলা গল্প। ভয় এখানে শুধু অনুভূতি নয়—এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
ক্ষমতার বীজ থেকে বিষবৃক্ষ- ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই আধিপত্যের গল্প আজ বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
শ্রমিক রাজনীতির ছায়ায় জন্ম নেওয়া একটি গোষ্ঠী—সময় বদলেছে, পরিচয় বদলেছে, কিন্তু তাদের ক্ষমতার ক্ষুধা বদলায়নি। টেন্ডার, বদলি, নিয়োগ—সবকিছুই যেন তাদের হাতের খেলনা। অফিসে না থেকেও অফিস নিয়ন্ত্রণ—এ যেন অদৃশ্য সিংহাসনে বসে থাকা এক অঘোষিত শাসকগোষ্ঠী।
উদ্ধত উচ্চারণ—ক্ষমতার নগ্নতা- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারীর ভাষায়— ওরা বলে—আমাদের কিছুই করতে পারবে না… যতদিন আছি, এভাবেই চলবে!
এই একটি বাক্যেই যেন ভেঙে পড়ে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর মর্যাদা।
নীরবতার দায় কার? সবকিছু ঘটছে চোখের সামনে, অথচ নীরবতা ঘিরে রেখেছে কর্তৃপক্ষকে।
এই নীরবতা কি অক্ষমতার? নাকি কোনো অদৃশ্য আশ্রয়ের? প্রশ্নগুলো বাতাসে ভাসছে, কিন্তু উত্তর নেই।
শোকজ—নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা? ২০ এপ্রিল ২০২৬—শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জারি হয় কারণ দর্শানোর নোটিশ। অভিযোগ গুরুতর—অসদাচরণ, দায়িত্বে অবহেলা, শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
শোকজ কি ন্যায়বিচারের সূচনা, নাকি কেবল সময়ক্ষেপণের এক প্রাতিষ্ঠানিক নাটক?
ভুক্তভোগীর আর্তি—একটি সরল আবেদন- মিজানুর রহমানের কণ্ঠে নেই রাজনীতি, নেই ক্ষমতা—
শুধু একটিই কথা— “আমি বিচার চাই…”
এই একটিমাত্র বাক্যই যেন পুরো ব্যবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন।
শেষ প্রশ্ন—ভয় ভাঙবে কবে?
বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি মানবিকতা এভাবে বন্দি হয়, তাহলে তা শুধু একটি অফিসের সংকট নয়—এটি রাষ্ট্রের আত্মার সংকট।
এখন দেখার বিষয়— ক্ষমতার এই অন্ধকার গহ্বর কি ভেঙে আলো আসবে, নাকি ‘টর্চার সেল’ নামের এই নিষ্ঠুর অধ্যায়ই হয়ে উঠবে নতুন স্বাভাবিকতা?
