রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাদক স্পট ঘিরে ‘মাসোয়ারা সিন্ডিকেট’! ময়মনসিংহে তোলপাড়, প্রশ্নের মুখে নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মামুনুর রশীদ মামুন
মে ১০, ২০২৬ ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ময়মনসিংহ শহর থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলা—অন্ধকারের এক বিস্তৃত মাদক সাম্রাজ্য যেন নীরবে গড়ে উঠেছে প্রশাসনের চোখের সামনেই।

স্থানীয়দের বিস্ফোরক অভিযোগ, কুখ্যাত মাদক স্পটগুলো শুধু টিকেই নেই, বরং নিয়মিত “মাসোয়ারা” দিয়েই চলছে রমরমা বাণিজ্য। অভিযোগের তীর উঠেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু সদস্যের দিকে, যারা নাকি সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে মাদক কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হলেও বাস্তবে বন্ধ হচ্ছে না কোনো স্পট। বরং অভিযানের আড়ালেই চলছে অদৃশ্য অর্থ বাণিজ্যের ভয়ংকর এক সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নগরীর ব্রিজ মোড় এলাকার আলোচিত “সুরমা স্পট” থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮ হাজার টাকা মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে “মাদক সম্রাজ্ঞী” হিসেবে পরিচিত হামে’র স্পট থেকেও নেওয়া হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা।

নগরীর ভৈরব রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সুবর্না গ্রেপ্তার হলেও থেমে নেই তার নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসা—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ওই এলাকা থেকেই নাকি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার টাকার মাসোয়ারা আদায় করা হয়। একই এলাকার গাঁজা ব্যবসায়ী জহিরুল সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।

জেলার বিভিন্ন উপজেলাগুলোতেও যেন একই চিত্র। হালুয়াঘাটের ধারা বাজারের মদ ব্যবসায়ী এতিনের কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা, ফুলবাড়িয়ার কথিত গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ী জীবন বাবুর কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

গৌরীপুর ও ভালুকা সংলগ্ন এলাকার মদপল্লী থেকে মাসে প্রায় ২৮ হাজার টাকা এবং গরুরহাট এলাকার আরেকটি মদপল্লী থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য দিয়েছেন স্থানীয়রা। ত্রিশালের ধলা বাজারের মেতরপল্লীতে মদের ব্যবসার সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচিত লিটন জেলা কার্যালয়কে ২২ হাজার এবং গোয়েন্দা শাখাকে ১৮ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা সচল রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া দাপুনিয়া এলাকার হাফিজুল, বাড়েরা এলাকার আনু ও খানা পাড়া এলাকার মোখলেসের বিরুদ্ধেও নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্যামগঞ্জ বাজারের আলোচিত গাঁজা ব্যবসায়ী আখালি ও মদ ব্যবসায়ী স্বাধীনও নিয়মিত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

সূত্রের দাবি, নান্দাইলের কথিত গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসায়ী রঙ্গুর কাছ থেকে সপ্তাহে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরানগঞ্জ এলাকার মদ ব্যবসা কেন্দ্রিক মাসোয়ারার পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার টাকা বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তারাকান্দা বাজারের পশ্চিম পাশে গাঁজা ব্যবসায়ী সোহেলের কাছ থেকেও প্রায় ২০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অর্থ আদায়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা ও গোয়েন্দা শাখার কয়েকজন সদস্য। বারবার উঠে আসছে এসআই আজগর, এএসআই মাইন উদ্দিন ও এএসআই মাহাবুবের নাম। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, এসব অর্থ আদায় নাকি সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধানের অলিখিত নির্দেশনাতেই হয়ে থাকে।

এদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ—মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের কাছ থেকেই সুবিধা নেওয়ার কারণে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছে তরুণ সমাজ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই বাড়ছে কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্তি। পরিবারে পরিবারে বাড়ছে অস্থিরতা, বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও সহিংস অপরাধ।

একাধিক সচেতন নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
যেসব জায়গা প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে থাকার কথা, সেসব জায়গাতেই দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারে না।

যারা অভিযোগ করে, তারাই পরে হয়রানির শিকার হয়।
অভিযোগগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ নাকি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছেন। এমনকি “ডিজি অফিস পর্যন্ত অদৃশ্য ক্ষমতার ছায়া” থাকার গুঞ্জনও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে যদি দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু বাহক বা ছোটখাটো বিক্রেতাদের আটক করলেই সমাধান আসবে না; বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

তাদের দাবি, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিলে সরকারের মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়েও জনমনে প্রশ্ন আরও গভীর হবে।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।