লুট করা অস্ত্র দিয়েই আধিপত্য বিস্তারে নামেন জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দারা। ছবি-সংগৃহীত
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প—সংকীর্ণ গলি, ঘনবসতি আর অন্ধকার অলিগলির আড়ালে যেন গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত মাদক সাম্রাজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের দাবি থাকলেও বাস্তবে ক্যাম্পজুড়ে এখনও সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১৩টি মাদক চক্র। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল ও বিয়ার বিক্রিকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চলে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ টহলের পাশেই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি
হুমায়ুন রোডসংলগ্ন লোহার গেট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মাত্র তিন ফুট প্রশস্ত অন্ধকার গলির দুই পাশে সারি সারি ঘরের সামনে শিশু, কিশোর, তরুণ ও নারীরা ছোট ছোট প্যাকেটে মাদক বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছেন। আশপাশে পুলিশ টহল থাকলেও প্রকাশ্যেই চলে এই কারবার।
১৩ চক্রের নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্প
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পে বর্তমানে অন্তত ১৩টি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। তাদের মধ্যে রয়েছে ভূঁইয়া সোহেল, মনু, পিচ্চি রাজা, চুয়া সেলিম, দিলদার, পোঁটলা মুন্নার শান্তি গ্রুপ, পাঁচুর চক্র, রাশেদ-রাজু গ্রুপ, রানী, মুনা ওরফে শহিদ, চার ভাইয়ের চক্রসহ আরও কয়েকটি দল।
একসময় ক্যাম্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদক মাফিয়া হিসেবে পরিচিত ছিলেন ইশতিয়াক ও নাদিম হোসেন ওরফে পঁচিশ। তাদের মৃত্যুর পর তাদের অনুসারীরাই পৃথক পৃথক গ্রুপ গড়ে তুলে এখন মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
অস্ত্রের ভয়ংকর মজুত
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন চক্রের হাতে রয়েছে অন্তত ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই শতাধিক ধারালো অস্ত্র। শটগান, পিস্তল, দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, চায়নিজ চাপাতি, সামুরাই, হকিস্টিক এবং সংঘর্ষের সময় ককটেল বা হাতবোমা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রাণহানি
মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত প্রায় ১৭ মাসে অন্তত ৯ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন মাদক চক্রের সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষও সংঘর্ষের শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
প্রতিদিন কোটি টাকার মাদক বিক্রির অভিযোগ
তথ্য অনুযায়ী—
প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার পুরিয়া হেরোইন বিক্রি হয়।
দৈনিক প্রায় ২০ হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি হয়।
৫০ কেজির বেশি গাঁজা খুচরা বাজারে বিক্রি হয়।
সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা, মাসে ৩০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার মাদক বিক্রি হয় বলে অভিযোগ।
অভিযানেও উদ্ধার কোটি কোটি টাকা
গত এক বছরে পরিচালিত দুটি অভিযানে শুধু ভূঁইয়া সোহেলের আস্তানা থেকেই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া শাহ আলমের আস্তানা থেকেও ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
কেন বন্ধ হচ্ছে না এই কারবার?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। জেনেভা ক্যাম্পের অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব এবং সংকীর্ণ বসবাসের পরিবেশ অনেককে মাদক ব্যবসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়া ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অতীতে এবং বর্তমানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা তাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে কিছু মাদক কারবারিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে যাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বা নিজেদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন।
পুলিশের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে প্রবেশ ও বের হওয়ার ৩০টিরও বেশি পথ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সাতটি প্রবেশপথে প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য যে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অভিযোগ, বিভিন্ন সূত্রের দাবি ও প্রতিবেদনে বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সবগুলো আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
