বুধবার, ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষক দিবসে শিক্ষকের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত হোক

ফারজানা আক্তার রিংকু
অক্টোবর ৬, ২০২৬ ১:২৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আজ শিক্ষক দিবস। এই দিনটি শুধু শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়, বরং তাঁদের অবদান, মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবারও দিন। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে আলোকিত করেন এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে নির্মাণ করেন এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন। তাই শিক্ষকের সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের সত্য, ন্যায়, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দেন। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব ও সমাজ। অথচ কখনো কখনো স্বার্থান্বেষী পরিবেশ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে কিছু শিক্ষকই সহকর্মী শিক্ষকদের প্রতি বৈরী আচরণে জড়িয়ে পড়েন। একজন আদর্শ শিক্ষকের কাছ থেকে এমন আচরণ কখনোই কাম্য নয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু অশিক্ষকসুলভ আচরণের কারণে শিক্ষকই কখনো কখনো তাঁর সহকর্মী শিক্ষকের শত্রুতে পরিণত হন। অপমান, ষড়যন্ত্র, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা নানা ধরনের অন্যায়ের মাধ্যমে কোনো সহকর্মীকে হেয় বা ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়, সহকর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মানবাধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীনতার নীতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা সমুন্নত রাখা জরুরি। সেই নীতির আলোকে শিক্ষকদের অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।

মনে রাখতে হবে, শিক্ষকও একজন মানুষ। তাঁর পরিবার আছে, প্রয়োজন আছে, আত্মসম্মান আছে এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আছে। তাই শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা গুজব, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা পক্ষপাতের ভিত্তিতে নয়—নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। আর কোনো শিক্ষক অভিযোগ থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাঁর হারানো সম্মান ও অধিকার যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়াও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।

আমরা করুণা চাই না, আমরা চাই ন্যায্য অধিকার। আমরা বিশেষ সুবিধা চাই না, আমরা চাই সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।

আমার লেখকজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আজকের শিক্ষক দিবসে ফিরে তাকাতে চাই আশির দশকের সেই দিনগুলোর দিকে। তখন একজন এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসে মাত্র ২২০ টাকা বেতন পেতেন—তাও তিন-চার মাস পরপর। সেই সময়ের শিক্ষকদের করুণ জীবন-জীবিকার কথা মনে পড়লে আজও বিবেক নাড়া দেয়। অর্থনৈতিক অনটন, সামাজিক অবহেলা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে গেছেন, প্রজন্ম গড়ে তুলেছেন।

আজকের শিক্ষক আর আশির দশকের শিক্ষক—সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, শিক্ষকদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এখনো আমাদের দেশে শিক্ষক সমাজ তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। তাই শুধু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নয়, সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের আরও উপযুক্ত সম্মান জানাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশ জাপানের দিকে তাকানো যেতে পারে। সেখানে শিক্ষকতা পেশাকে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হয়। শিক্ষকদের প্রতি সামাজিক সম্মান অত্যন্ত দৃঢ়। তাঁদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদেরও জাপানের মতো উন্নত সমাজগুলোর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষকতার মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু উন্নত অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই জাতি তার শিক্ষককে কতটা সম্মান করে তার ওপর। যে সমাজ শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে, সে সমাজই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজে পরিণত হতে পারে।

তাই আসুন, আমরা শিক্ষককে শুধু ফুল দিয়ে নয়—তাঁর অধিকার রক্ষা করে সম্মান জানাই। তাঁর কণ্ঠকে সম্মান করি, তাঁর পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করি, তাঁর ন্যায্য দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই এবং কোনো অন্যায় অভিযোগ বা ষড়যন্ত্রের শিকার হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করি।

কারণ মানুষ গড়ার কারিগরকে অপমান করে কখনোই মর্যাদাবান সমাজ গড়ে তোলা যায় না।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক পরিবেশে পরিণত করাই হোক এবারের শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার।

শিক্ষককে সম্মান করুন। তাঁর অধিকার নিশ্চিত করুন। শিক্ষার পরিবেশকে নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক করে তুলুন।

আজকের এই অঙ্গীকারই আগামী দিনের বাংলাদেশকে আরও জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করবে। শিক্ষা খাতে আসবে আরও ইতিবাচক ও আমূল পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের মূল কারিগর হবেন আমাদের শিক্ষকরা।

শিক্ষকরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। আসুন, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করি।

শুভ শিক্ষক দিবস।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।