নির্বাচন কমিশন ভবন (ফাইল ছবি)
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন যেন এখন অনেক মানুষের জন্য এক অন্তহীন দুর্ভোগের নাম। বয়স কিংবা নামের বানান সংশোধনের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসছেন মানুষ। কিন্তু দিনের পর দিন ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। উল্টো নতুন নতুন কাগজপত্রের চাহিদা, অনলাইন আবেদনের ত্রুটি আর কর্মকর্তাদের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা।
নোয়াখালীর সত্তরোর্ধ্ব মামুনুর রশীদের গল্প যেন সেই ভোগান্তিরই প্রতিচ্ছবি। আড়াই মাস ধরে নিজের এনআইডির বয়স ও নামের বানান সংশোধনের জন্য বারবার নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই কখনও আবেদনে ভুল, কখনও নতুন কাগজপত্রের অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অষ্টম তলায় এনআইডি নিবন্ধন অনুবিভাগের করিডরে দেখা মেলে তার। হতাশ কণ্ঠে তিনি জানান, প্রতিবার ঢাকা আসতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হচ্ছে, অথচ কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। দরিদ্র মানুষ হিসেবে এই ব্যয় বহন করাও তার জন্য হয়ে উঠেছে দুঃসহ।
শুধু মামুনুর রশীদ নন—প্রতিদিনই দেশের নানা জেলা থেকে শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করছেন নির্বাচন ভবনের এনআইডি অনুবিভাগে। কেউ বয়স সংশোধন করতে, কেউ নামের ভুল ঠিক করতে, আবার কেউ পাসপোর্ট বা ভিসা জটিলতা নিরসনের আশায় ছুটছেন ঢাকায়। কিন্তু অধিকাংশের কপালেই জুটছে দীর্ঘ অপেক্ষা আর হয়রানি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে উপজেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় থেকেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বয়স সংশোধনের কাজ করা যেত। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে বয়স সংশোধনের ক্ষমতা রাখতেন। তবে মাঠপর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে নির্বাচন কমিশন প্রবিধান সংশোধন করে সব ধরনের বয়স সংশোধনের ক্ষমতা এককভাবে এনআইডি মহাপরিচালকের হাতে ন্যস্ত করে। এরপর থেকেই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক এই জটিলতা ও ভোগান্তির চিত্র আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, এনআইডি অনুবিভাগের করিডরজুড়ে উদ্বিগ্ন ও ক্লান্ত মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা। কেউ সন্তান কোলে নিয়ে বসে আছেন, কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন কর্মকর্তাদের কক্ষের সামনে। বসার জায়গা না পেয়ে অনেকে করিডরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভোগান্তির শিকার হলেও পরবর্তী হয়রানির আশঙ্কায় বেশিরভাগ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক যুবক আবদুল কুদ্দুস (ছদ্মনাম) জানান, জরুরি পাসপোর্ট করতে গিয়ে এনআইডির বয়স সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে তার। কিন্তু আবেদন করার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তাদের কক্ষে কক্ষে ঘুরেও কোনো সমাধান পাননি। ফলে তার পাসপোর্ট প্রক্রিয়াও আটকে আছে।
একই দুর্ভোগে পড়েছেন পটুয়াখালীর গফুর মুন্সী (ছদ্মনাম)। মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলের এনআইডির বয়স সংশোধনের জন্য দুই মাস ধরে ঢাকায় আসা-যাওয়া করছেন তিনি। গফুর মুন্সীর ভাষায়, ছেলের ভিসার মেয়াদ আর মাত্র ১০ দিন আছে। এর মধ্যে সংশোধন না হলে তাকে দেশে ফিরে আসতে হবে।
জানা গেছে, দেশের ৬৪ জেলাকে ১০ অঞ্চলে ভাগ করে নির্বাচন ভবনের অষ্টম তলায় সহকারী পরিচালকদের দপ্তরে অনলাইন আবেদন যাচাই-বাছাই ও নথি প্রস্তুতের কাজ করা হয়। পরে পরিচালকের অনুমোদনের পর মহাপরিচালকের চূড়ান্ত অনুমোদনে সংশোধিত এনআইডি দেওয়া হয়। তবে একাধিক তথ্য সংশোধনের আবেদন হলে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কিংবা শুনানির জন্য আবেদনকারীকে আবারও ঢাকায় ডাকা হচ্ছে। এতে বাড়ছে দুর্ভোগ ও সময়ক্ষেপণ।
অন্যদিকে, এনআইডি সংক্রান্ত সহায়তার জন্য চালু থাকা ইসির কলসেন্টার থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগ রয়েছে, ১০৫ নম্বরে ফোন করলে অধিকাংশ সময় সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তথ্য ও সহায়তা না পেয়ে আরও বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক আবুল হাসনাত মুহম্মদ আনোয়ার পাশা বলেন, তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
আর ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ দাবি করেছেন, এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতেই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে অনৈতিক অর্থ লেনদেন কমেছে। তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে আসায় পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
