দুর্নীতি দমন কমিশন ভবন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বোচ্চ কাঠামো ‘কমিশন’ ছাড়াই কেটে যাচ্ছে আড়াই মাস। ফলে নতুন মামলা অনুমোদন, অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পদ ক্রোক, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা অর্থপাচারবিরোধী আইনি পদক্ষেপ—সবকিছুই কার্যত থমকে গেছে। প্রশাসনিক রুটিন কাজ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটির কার্যক্রমে নেমে এসেছে এক ধরনের অচলাবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তবে কমিশনবিহীন অবস্থায় এত দীর্ঘ সময় আগে কখনও পার হয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এমন বাস্তবতায় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথা জোরালোভাবে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে দুদক এখন নেতৃত্বহীন ও অকার্যকর—এমন অভিযোগ উঠছে নানা মহল থেকে।
দুদক সূত্র জানায়, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর থেকেই কমিশন শূন্য হয়ে পড়ে সংস্থাটি। এরপর আর নতুন কমিশন গঠন হয়নি। বর্তমানে দুদকের ছয়টি অনুবিভাগে দুই হাজারের বেশি অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকশ অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় মামলা দায়ের করা যাচ্ছে না। একইভাবে তদন্ত শেষ হওয়া মামলার অভিযোগপত্রও আটকে আছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আগের কমিশনের অনুমোদিত অনুসন্ধান ও তদন্ত চললেও নেতৃত্বহীন অবস্থায় দুদক দুর্বলতা ও স্থবিরতায় ভুগছে। তার মতে, কমিশন না থাকায় বাস্তবে দুর্নীতির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কমিশন গঠনে আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হওয়াও সরকারের জন্য বিব্রতকর।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—দুদককে দীর্ঘ সময় স্থবির করে রাখার মাধ্যমে সরকার কি অনিচ্ছাকৃতভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে?
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানান, নতুন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি করার কাজ শিগগির শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে দুদক আইন সংশোধনের একটি প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সদ্যবিদায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান।
দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম বলেন, কমিশন না থাকায় বর্তমানে শুধু অভিযোগ গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আগের কমিশনের অনুমোদিত অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চললেও নতুন মামলা, অভিযোগপত্রসহ কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ বন্ধ রয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, গত ৩ মার্চের পর থেকে নতুন কোনো মামলা অনুমোদন হয়নি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য বিদেশে এমএলএআর পাঠানো যায়নি। কোনো আসামির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সম্পদ ক্রোক বা ব্যাংক হিসাব জব্দের কাজও থেমে আছে। এমনকি ফাঁদ পেতে ঘুষখোর ধরার অভিযানও কার্যত বন্ধ।
শুধু তাই নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পুনর্গঠন, গণশুনানি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা কিংবা কর্মকর্তা পদোন্নতির মতো অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। বর্তমানে ১০টি পরিচালক পদ খালি থাকলেও পদোন্নতি না হওয়ায় সেগুলো পূরণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ প্রয়োজনে ১০ লাখ টাকার বেশি কেনাকাটাও সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
এদিকে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদ নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য নামের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা, সাবেক স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া ও সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন।
সব মিলিয়ে, দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির দীর্ঘ নেতৃত্বশূন্যতা এখন শুধু প্রশাসনিক অচলাবস্থাই নয়, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়েও বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
