শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রশ্নফাঁসের সাম্রাজ্য: গাড়িচালক থেকে শত কোটি টাকার মালিক আবেদ, চার্জশিটে বেরিয়ে এলো ৫৫ সদস্যের গোপন নেটওয়ার্ক

স্টাফ রিপোর্টার
জুন ৫, ২০২৬ ৯:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একসময় সংসার চালাতেই হিমশিম খেতেন। পেশায় ছিলেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন গাড়িচালক। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে যায় ভাগ্যের চাকা। গ্রামের মাটির ঘর ছেড়ে গড়ে ওঠে প্রাসাদসম বাড়ি, ঢাকায় একের পর এক ফ্ল্যাট ও জমির মালিকানা। স্থানীয় রাজনীতিতেও হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী মুখ। প্রশ্ন উঠেছিল—কীভাবে?

অবশেষে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে বহুল আলোচিত পিএসসির প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির চার্জশিটে। তদন্ত বলছে, সরকারি চাকরির স্বপ্নকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী। তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হতো ৫৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী চক্র, যার শিকড় ছড়িয়ে ছিল পিএসসি, সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

গত ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া ৪১ পৃষ্ঠার চার্জশিটে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। মামলাটি দায়ের হয়েছিল ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্র।

প্রশ্ন যেত আগেই, চাকরি হতো পরে!

তদন্তে জানা গেছে, পরীক্ষার আগেই বাছাইকৃত প্রার্থীদের হাতে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হতো। নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে তাদের প্রশ্ন মুখস্থ করানো হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এরপর পরীক্ষার হলে পাঠানো হতো নিশ্চিত সফলতার আশ্বাস দিয়ে। বিনিময়ে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের টাকা।

চার্জশিট অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালরা। তদন্তকারীদের ভাষায়, “এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ।”

৫৫ জনের চক্র, গ্রেফতার ৩৬

চক্রটির ৫৫ সদস্যের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৬ জন গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি দপ্তরের কর্মচারী, ব্যবসায়ী এবং আবেদ আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। অন্যদিকে ১৯ জন এখনও পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।

তদন্তে জড়িত না থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য মিললেও তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

গাড়িচালক থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

সবচেয়ে আলোচিত নাম আবেদ আলী। তদন্ত বলছে, প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের অর্থেই তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য। মাদারীপুরের ডাসারে আলিশান বাড়ি, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, জমি ও নানা সম্পদের খোঁজ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। শুধু তাই নয়, নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রচারণাও চালিয়েছিলেন তিনি।

একসময় যার পরিবার অর্থকষ্টে দিন কাটাত, সেই আবেদের হঠাৎ উত্থান এখন প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজি প্রেস থেকে মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের এই নেটওয়ার্ক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বিস্তার ছিল বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা পর্যন্ত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নিয়োগ পরীক্ষার গোপনীয়তা কার্যত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু প্রশ্নফাঁস নয়; এটি মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। হাজার হাজার মেধাবী চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন ও পরিশ্রমকে পেছনে ফেলে অর্থের বিনিময়ে চাকরি বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে এই মামলায়।

সামনে আসতে পারে আরও বড় নাম

চার্জশিটে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

তবে তদন্ত এখানেই থেমে নেই। চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে থাকা বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মানি লন্ডারিং তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের আর্থিক পরিধি ও নেপথ্যের আরও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম সামনে আসতে পারে।

রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম বড় এই কেলেঙ্কারি এখন আদালতের কাঠগড়ায়। কিন্তু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রশ্নফাঁস সাম্রাজ্য কারা আড়াল করে রেখেছিল, আর কতজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এখনও পর্দার আড়ালে রয়েছেন?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।