ফাইল ছবি সংগৃহীত
বিল ছাড়ে কমিশন, সাইট ভিজিটে ঘুষ, সরকারি রোলার চালাতেও টাকার খেলা—অভিযোগের পরও নীরব নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান; প্রশ্নের মুখে পুরো এলজিইডি প্রশাসন।
ময়মনসিংহে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর একটি কার্যালয়কে ঘিরে যেন গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী “কমিশন সাম্রাজ্য”। অভিযোগ উঠেছে—এখানে নিয়ম-কানুনের চেয়ে বেশি কার্যকর “৩% কমিশন”-এর অলিখিত আইন। কাজ শেষ হতে ২০% পার্সেন্টে পৌঁছে।
ঠিকাদারদের ভাষায়, কমিশন ছাড়া বিল ছাড় হয় না, ফাইল এগোয় না, এমনকি প্রকল্পের কাজও পড়ে যায় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
বিশেষ প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ মামুনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। ঠিকাদারদের দাবি, বিল উত্তোলনের আগে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। কেউ সেই অঘোষিত শর্ত মানতে ব্যর্থ হলেই শুরু হয় ফাইল জট, বিলম্ব আর প্রশাসনিক হয়রানি। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, “এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।
সাইট ভিজিটেও ‘কমিশন নাটক’। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিদর্শনেও চলছে অস্বচ্ছ লেনদেনের খেলা। অর্থ দিলে “সাইট না দেখেই” ইতিবাচক রিপোর্ট, আর টাকা না দিলে ভালো কাজেও নেতিবাচক মন্তব্য—এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন ও রাসেলের বিরুদ্ধেও উঠেছে ঘুষ ও হয়রানিমূলক রিপোর্টের অভিযোগ। ঠিকাদারদের ভাষায়, রিপোর্টের ভাষা নির্ধারণ হয় কাজ দেখে নয়, টাকার পরিমাণ দেখে।
সরকারি রোলারও চলে ‘টাকার তালে’। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত সরকারি রোলার নিয়েও রয়েছে বিস্ফোরক অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা, ডিজেল খরচ এবং চালকের আলাদা সম্মানী না দিলে রোলার পাওয়া যায় না।
ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি যন্ত্রপাতিও এখন যেন কমিশননির্ভর ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।
আগের প্রতিবেদনের পর আরও বেপরোয়া?
গত ২৯ এপ্রিল “সমতল ভূমি”-তে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন— “কমিশনের অদৃশ্য জাল: ময়মনসিংহে এলজিইডির ভেতরে দুর্নীতির নীরব সাম্রাজ্য”— প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগ প্রকাশের পর দুর্নীতির লাগাম টানার বদলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফলোআপ প্রতিবেদনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী সালমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
“অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে” সালমান? অভিযোগকারীদের দাবি, ৩% কমিশনের বাইরেও নির্বাহী প্রকৌশলী সালমানের জন্য আলাদা ৭% কমিশন নির্ধারণ করা হয়, যদিও এর কোনো লিখিত প্রমাণ নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই কমিশন না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়।
একাধিক সূত্রের দাবি, অ্যাকাউন্টেন্ট শহিদুল ইসলাম তার নির্দেশেই কমিশন আদায়ের কাজ পরিচালনা করেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নীরবতা কি দোষ স্বীকার? বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নির্বাহী প্রকৌশলী সালমানের কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। সাধারণ ঠিকাদার ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—এই নীরবতা কি দোষ স্বীকার, নাকি প্রভাবশালী দাপটের আড়ালে দায় এড়ানোর কৌশল?
নেটিজেনদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে মনে করছেন, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত তদন্ত না হলে পুরো এলজিইডি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমে যাবে।
এদিকে নিউজ প্রকাশের পর স্থানীয় অনুসন্ধানী রিপোর্টর মামুনুর রশীদ এর হুমকি প্রদান করা হচ্ছে। হুমকির বিষয় কথা বলতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান ফোন কল গ্রহণ করছেন না। ফোন রিসিভ না করা এবং কথা না বলায় তার উপর আরো সন্দেহ বেড়ে গিয়েছে।
ভয়ের সংস্কৃতি, নীরবতার দেয়াল-অনেকেই সত্য জানেন, কিন্তু প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বদলি, চাকরি হারানো ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয়। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও অধিকাংশই রয়েছেন নীরব।
এখন নজর চিফ ইঞ্জিনিয়ারের দিকে। সাধারণ ঠিকাদারদের প্রশ্ন—এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন কী ব্যবস্থা নেন? আদৌ কি হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, নাকি সবকিছু আবারও চাপা পড়ে যাবে প্রভাবের আড়ালে?
সুশীল সমাজ বলছে, এখনই প্রয়োজন উচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একটি অফিসের অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
এখন দেখার বিষয়—ময়মনসিংহ এলজিইডির এই কথিত অদৃশ্য সাম্রাজ্যের” পর্দা কবে সরবে, আর কবে সামনে আসবে প্রকৃত সত্য।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী সংখ্যায়… চলমান।
