মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেরুল বাড্ডায় রাজউকের ১১ একর জমি বেদখল, ২১ বছরেও উদ্ধারে উদ্যোগ ‘জিরো’ বছরে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ৫, ২০২৬ ৯:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কাঁচাবাজার, মাছ-মুরগি ও বাঁশের আড়তে জমজমাট অবৈধ বাণিজ্য। ৬ হাজার মানুষের কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। ফাইল ছবি

রাজধানীর মেরুল বাড্ডা। মূল সড়ক ঘেঁষে প্রায় ১১ একর জমি। বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অথচ বিপুল মূল্যমানের এ জমি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিজস্ব সম্পত্তি হলেও গত ২১ বছর ধরে রয়েছে বেদখলে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জমিটি উদ্ধারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং একের পর এক রিট মামলার আড়ালে আটকে আছে জমি উদ্ধারের প্রক্রিয়া।

রাজউকের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে পাঁচটি রিট মামলা। কিন্তু ২১ বছরেও এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর আইনি তৎপরতার অভিযোগ নেই। ফলে আইনি জটিলতা ও সংস্থার নিষ্ক্রিয়তাকে পুঁজি করে জমিটির ওপর গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার, মাছ-মুরগি ও বাঁশের বিশাল আড়ত, বস্তি এবং নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদলে দখলদারদের চেহারা বদলালেও বন্ধ হয়নি অবৈধ বাণিজ্য। বরং সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়েছে দখল ও বাণিজ্যের পরিধি। এসব আড়ত ও দোকান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা স্পটভাড়া ও অন্যান্য খাতে আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র নামে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাসে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে টাকা দেওয়ার পরও অধিকাংশ সদস্যের ভাগ্যে জোটেনি কাঙ্ক্ষিত দোকান। ফলে একদিকে সরকারি জমি বেদখল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ—দুই দিক থেকেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।

১৯৬২ সালে ডিআইটির কাছে জমি হস্তান্তর

নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় সিএস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশের মাধ্যমে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল জমিটি ডিআইটির কাছে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তৎকালীন টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারার আওতায় অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্ষমতাবলে জমির দখল গ্রহণ করে ডিআইটি এবং ডিআইটির অনুকূলে দেওয়া হয় ‘দখল হস্তান্তর সনদ’।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক করা হয়। অর্থাৎ জমিটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ রাজউকের কাছেই থাকার কথা।

কিন্তু ২০০৫ সালে জমিটি নিজেদের দখলে রাখার উদ্দেশ্যে হাইকোর্টে রিট করেন দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী। মামলাটির নম্বর ৫৬১০। একই বছর রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার নেতৃত্বে ওই জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে উচ্ছেদ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আরেকটি রিট করা হয়।

পরবর্তীতে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও ২০০৭ সালে রিট মামলা করে। এ মামলার নম্বর ২১৪১। এভাবে ধাপে ধাপে জমিটি দখলে রাখার জন্য পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিটি মামলাই রাজউকের বিরুদ্ধে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, রিট মামলাগুলো মোকাবিলা করে জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আইনি প্রস্তুতি নিয়ে রাজউকের পক্ষ থেকে কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি।

জমির ওপর আড়ত-বাজার, পাশে বস্তি

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ থেকে কয়েক গজ দূরেই মূল সড়ক ঘেঁষে রয়েছে বাঁশের আড়ত। রয়েছে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র সাইনবোর্ড। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাছ ও মুরগির আড়ত, অসংখ্য দোকান এবং বিশাল বস্তি।

ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ, মুরগি ও বাঁশবোঝাই ট্রাক এসে সেখানে ভিড় করে। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পাইকারি বাজার জমজমাট থাকলেও দিনের অন্য সময়ে তুলনামূলক নীরবতা নেমে আসে।

অবিক্রীত পাইকারি মুরগি খুচরা বিক্রির জন্য টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একাধিক অস্থায়ী ঘর। একটি ছোট টিনের ঘরে রয়েছে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর অফিস।

আড়তের পাশেই গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকের আড্ডা বসে। সরেজমিনে উঠতি বয়সী ছেলেদের বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিতে দেখা গেছে।

১১ একর জমির পাশেই রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।

ক্ষমতার পালাবদলে বদলেছে দখলের নেতৃত্ব?

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর জমি দখলের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী এসব আড়ত থেকে টাকা ওঠাচ্ছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে রাজউক জমিটির মালিকানা দাবি করলেও সেখানে একটি সাইনবোর্ডে জমিটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে দাবি করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূঁইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম রয়েছে।

সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ দেখানো হয়েছে।

‘রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য রিট, অনেকে কাজ করতে চান না’

মেরুল বাড্ডার ১১ একর জমি উদ্ধার এবং রিট মামলার বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করেছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।

রাজউকের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে যেখানে এক ইঞ্চি জমি খালি থাকলেও দ্রুত বহুতল ভবন গড়ে ওঠে, সেখানে মূল সড়কের পাশে ১১ একর সরকারি জমি যুগের পর যুগ বেদখলে থাকা অস্বাভাবিক। তাঁদের দাবি, মামলা নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি জমির প্রকৃত অবস্থা ও দখলদারদের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন।

৩০০ কোটি টাকার ‘দোকান’ প্রতারণার অভিযোগ

মেরুল বাড্ডার জমির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ। প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষকে স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জমির ওপর মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’র নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সমিতির যাত্রা শুরু হয়। ধাপে ধাপে সদস্যসংখ্যা বেড়ে প্রায় ছয় হাজারে পৌঁছে।

সমিতির সদস্যরা দীর্ঘ ৩৮ বছরে প্রত্যেকে কমবেশি ৫ লাখ টাকা করে দিলে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দাঁড়ায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

এ ছাড়া জমি বরাদ্দ পেতে রাজউকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির নামে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ফান্ড থেকে ৫ কোটি টাকা ঘুষের লেনদেন ও নয়ছয় করা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ ব্যবসায়ীদের অর্থ দিয়ে একদিকে ঘুষ বাণিজ্য চালানো হয়েছে, অন্যদিকে সমিতির নেতারা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। তবে রাজউকের দাবি, মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

রসিদে রসিদে কিস্তি, তবু মেলেনি দোকান

জমির ওপর গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানদার জানান, মেরুল বাড্ডার জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের সঙ্গে স্থানীয়দের বিরোধ ও টানাপোড়েন চলছে। জমিটি আসলে কার—এই আইনি জটিলতা ও অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করেই একটি প্রভাবশালী চক্র মাঠে নামে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’ গঠন করে সাধারণ মানুষের সামনে স্থায়ী দোকানের স্বপ্ন দেখানো হয়। প্রচার করা হয়, সেখানে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণ করা হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূল্যে দোকান পাবেন।

কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও সেই মার্কেট নির্মিত হয়নি। সদস্যদের অধিকাংশই দোকান পাননি। অথচ রসিদ ও নানা অজুহাতে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নোটিশ দিয়ে নেওয়া হয়েছে বাড়তি টাকা

২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদের স্বাক্ষরিত একটি নোটিশেও সদস্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

নোটিশে প্রত্যেক সদস্যকে সমিতির মামলা খরচ ও অন্যান্য বাবদ এক হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করতে বলা হয়। একই সঙ্গে যেসব সদস্য মারা গেছেন কিংবা অন্যত্র চলে গেছেন, তাঁদের সদস্যপদ ওয়ারিশ বা অন্যের নামে হস্তান্তরের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। এজন্য সমিতিকে দুই হাজার টাকা করে দিতে বলা হয়েছিল। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

উচ্ছেদ অভিযানেও থামেনি কার্যক্রম

২০০৫ সালের দিকে রাজউক ওই বিতর্কিত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। এতে সমিতির কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা দেখা দেয়। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ সদস্যরা এবং অনেকেই চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দেন।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তখনও থেমে থাকেননি। মেরুল বাড্ডা থেকে কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয় মতিঝিলে। সেখানকার অস্থায়ী কার্যালয় থেকে নতুন করে সদস্যদের নানা আশ্বাস দেওয়া হয়।

রাজউকের আইনি জটিলতা শিগগিরই কেটে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে ফের চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে সদস্যদের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।

৩০০ কোটি টাকার হিসাব কোথায়?

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মিত হয়নি কাঙ্ক্ষিত কাঁচাবাজার বা মার্কেট। সদস্যদেরও মেলেনি স্বপ্নের দোকান। অথচ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা তহবিলে জমা পড়ার দাবি রয়েছে।

সমিতির বর্তমান নেতৃত্বের অভিযোগ, পরিচালনা পর্ষদের সাবেক শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সদস্যদের টাকা তছরুপ ও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অনেকে মারা গেছেন, অনেকে দায়িত্ব এড়িয়ে চলছেন। ফলে বিশাল অঙ্কের অর্থের বর্তমান অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন দীর্ঘদিনের সদস্যরা। কেউ বার্ধক্যে পৌঁছেছেন, কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাঁদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত স্বপ্ন এখন সন্তান ও উত্তরসূরিরা বহন করছেন। অনেক উত্তরসূরিও দোকানের আশায় সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ করছেন বলে জানা গেছে।

সদস্যদের কণ্ঠে ক্ষোভ

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।

আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।

‘অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকা লুটপাটের কারণে কার্যক্রম থমকে গেছে’

মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির দীর্ঘ ১৭ বছর সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা শাহীন বর্তমানে সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।

তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে সমিতি যাত্রা শুরু হয়েছিল। একটানা ৩০ বছর পর্যন্ত সমিতির সদস্যরা চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।

শাহীন আরও বলেন, একসময় আমাদের এ সমিতিতে ছয় হাজারের বেশি সদস্য ছিলেন। কষ্টার্জিত আয় থেকে সমিতিতে নিয়মিত চাঁদা দিয়েছেন। সমিতির সাবেক সভাপতি রফিকুল এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির—দুজনই আজ প্রয়াত, কিন্তু তাঁরা সাধারণ ব্যবসায়ীদের ফান্ডের টাকা চরমভাবে তছরুপ ও আত্মসাৎ করে গেছেন। শত শত সাধারণ সদস্যের ঘাম ঝরানো টাকায় নিজেদের পকেট ভারী করা হয়েছে। যার কারণে আজ হাজার হাজার সদস্য তাঁদের অধিকার হারিয়েছেন, আর সমিতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে গেছে। সদস্যদের কোটি কোটি টাকা এভাবে গায়েব করে দেওয়া কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি প্রতারণা।

তিনি আরও বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউক বলছে, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। আমরা রাজউকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেছি—২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।

তদন্ত ও জমি উদ্ধারের দাবি

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—রাজউকের চোখের সামনে কীভাবে একটি সমিতির বিরুদ্ধে ওঠা ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বছরের পর বছর অমীমাংসিত থাকতে পারে? একই সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন বিপুল মূল্যমানের জমি কীভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দখলে থাকতে পারে?

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেরুল বাড্ডার ১১ একর জমির মালিকানা, দখল, রিট মামলা, অবৈধ স্থাপনা, আড়ত থেকে আদায়কৃত অর্থ এবং মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির প্রায় ৩০০ কোটি টাকার তহবিল—সবকিছু নিয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে দ্রুত রিট মামলাগুলোর আইনি নিষ্পত্তি করে রাজউকের জমি উদ্ধার, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সাধারণ সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, সমিতির ব্যাংক হিসাব, সদস্যদের রসিদ, জমির দলিলপত্র এবং আদালতের নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি উঠেছে।

সরকারি ১১ একর জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অথচ দীর্ঘ ২১ বছর ধরে জমিটি বেদখলে থাকায় শুধু সম্পত্তির ব্যবহার থেকেই নয়, সম্ভাব্য বিপুল রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এত মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে আর কত বছর অপেক্ষা করবে রাজউক?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।