বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৫ বছর পলাতক থাকার পর লিবিয়ায় ধরা মানব পাচারচক্রের হোতা নজরুল, দেশে ফেরানোর প্রস্তুতি

আবদুর রহমান
জুন ৪, ২০২৬ ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নজরুল ইসলাম মোল্লা। ছবি সংগৃহীত

অবশেষে ধরা পড়ল আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্রের অন্যতম অভিযুক্ত বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম মোল্লা। পাঁচ বছর ধরে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় থাকা এই পলাতককে গ্রেপ্তার করেছে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বর্তমানে তিনি দেশটির একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের খবর ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।

ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়াবহ সব অভিযোগ—মানব পাচার, অপহরণ, মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ। ২০২০ সালের মে মাসে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানব পাচারকারীদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার বহুল আলোচিত ঘটনার অন্যতম আসামি তিনি।

রেড নোটিশের ৫ বছর পর গ্রেপ্তার

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২১ সালের নভেম্বরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছয়জন শীর্ষ মানব পাচারকারীকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায়। সেই তালিকায় ছিলেন নজরুল ইসলাম মোল্লা, মিন্টু মিয়া, স্বপন, তানজিরুল, জাফর ইকবাল ও শাহাদত হোসেন।

দীর্ঘ পাঁচ বছর নজরদারির পর অবশেষে নজরুলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) বদরুল আলম মোল্লা বলেন, লিবিয়ায় নজরুলকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। তাকে দেশে আনা গেলে মানব পাচারচক্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

ইন্টারপোলের নথিতে কী আছে?

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে নজরুল ইসলাম মোল্লাকে মাদারীপুরের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৭ সালের ৪ মে জন্মগ্রহণকারী এই ব্যক্তির ছবি ও পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে।

ইন্টারপোলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি সংঘব ইন্টারপোলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য। বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলা, অবৈধভাবে আটকে রাখা, মুক্তিপণ আদায় এবং হত্যার মতো অপরাধে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

‘গেমিং’ নামে মৃত্যুর ফাঁদ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত জীবনের আশায় অনেক বাংলাদেশি তরুণ দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই অবৈধ যাত্রাপথকে পাচারকারীরা নিজেদের ভাষায় ‘গেমিং’ বলে থাকে।

মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা। অনেকেই সাগরে ডুবে মারা যান, আবার অনেকে অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের শিকার হন।

তদন্তকারীদের মতে, নজরুল ইসলাম মোল্লা এই ‘গেমিং’ সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা।

রেড নোটিশে আরও যাদের নাম

বর্তমানে ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৫৯ জন। তাদের মধ্যে মানব পাচারের অভিযোগে নজরুল ছাড়াও রয়েছেন কিশোরগঞ্জের মিন্টু মিয়া, তানজিরুল ও স্বপন।

এর আগে রেড নোটিশভুক্ত দুই মানব পাচারকারী গ্রেপ্তার হন। জাফর ইকবাল ইতালিতে এবং শাহাদত হোসেন ঢাকায় গ্রেপ্তার হন।

মিজদাহ হত্যাকাণ্ড: ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যু

ছয় বছর আগে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের মিজদাহ শহরের একটি ক্যাম্পে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং আহত হন আরও ১২ জন।

এই ঘটনার পর সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন ও বনানী থানায় তিনটি মামলা দায়ের করে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ২৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় মোট ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সিআইডির অনুরোধে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির সুপারিশ করে। এখন পর্যন্ত রেড নোটিশভুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের গতিবিধিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বাড়ছে মানব পাচারের মামলা

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

২০২৫ সালে মামলা: ১২২টি

২০২৪ সালে মামলা: ১০০টি

২০২৩ সালে মামলা: ৮৬টি

২০২২ সালে মামলা: ১১৪টি

গত পাঁচ বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ টিমের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৪৪ জন।

লিবিয়া থেকে ফিরছেন বাংলাদেশিরা

সর্বশেষ গত ১ জুন লিবিয়া থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ উদ্যোগে তাদের প্রত্যাবাসন করা হয়।

প্রত্যাবাসিতদের অধিকাংশই মানব পাচারকারীদের প্ররোচনায় অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। তাদের অনেকে অপহরণ, নির্যাতন ও জিম্মি অবস্থার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

এদিকে নজরুল ইসলাম মোল্লার গ্রেপ্তারকে মানব পাচারবিরোধী অভিযানে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশা, তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে আন্তর্জাতিক মানব পাচার নেটওয়ার্কের আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।