রাজধানীর অভিজাত গুলশানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক রহস্যময় আর্থিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে এখন আলোচিত নাম—শফিউল্লাহ আল মুনির। নিজেকে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে, বিশেষ করে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা মোঃ আলী হোসেন ফকির-এর নাম ভাঙিয়ে তিনি চালিয়ে গেছেন প্রতারণার এক সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক—এমনই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
তবে অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা—আইজিপির সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্কই নেই। অথচ সেই নাম ব্যবহার করেই গড়ে তোলা হয়েছে প্রভাব, ভয়ভীতি এবং অর্থ আত্মসাতের এক বিস্তৃত বলয়।
প্রতারণার শেকড়: অতীত থেকেই বিতর্ক- ২০০৮ সালের এক অভিযানে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই ব্যক্তির অতীতও কম বিতর্কিত নয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় পরিচালিত অভিযানে মাদকদ্রব্য ও পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা তার অতীতকে ঘিরে তোলে নতুন প্রশ্নে। সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে তিনি পরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে—কিন্তু অভিযোগ, আড়ালে চলতে থাকে একই পুরনো খেলা।
কোটি টাকার হিসাবের অমিল- দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য—
১১ কোটিরও বেশি সম্পদের মালিকানা, যার প্রায় পুরো অংশেরই বৈধ উৎস নেই!
আবার ঘোষিত আয় যেখানে মাত্র ৪৯ লাখ টাকার কিছু বেশি, সেখানে এই বিপুল সম্পদ যেন এক অমীমাংসিত ধাঁধা। তবে ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আদালতের আদেশে তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়—কারণ স্পষ্ট, দেশ ছাড়লে তদন্তে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা।
মামলা, চার্জশিট ও আইনি জটিলতা-তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে একের পর এক মামলা—প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগে। কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেলেও, একাধিক মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়েছে, যা তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
এদিকে ভুয়া প্রতিশ্রুতির ব্যবসা-অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং বিস্ময়কর—ব্যবসায়িক অংশীদার করার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া। বিদেশে পাঠানো, চাকরি দেওয়া, লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়, ব্যাংক ঋণ, পুলিশ বদলি—সবখানেই ‘তদবির বাণিজ্য’
খাগড়াছড়ি থেকে খুলনা—ভুয়া প্রকল্পের নামে বিনিয়োগ সংগ্রহ, আর সেই অর্থে বিলাসী জীবনযাপন—এই অভিযোগ যেন তার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে।
ভয়ভীতি ও প্রভাবের ছায়া- শুধু প্রতারণা নয়, অভিযোগ রয়েছে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়েরও। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার, হুমকি—এমনকি কারাগারে থেকেও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এক ঘটনায় ৭০ লাখ টাকা নিয়ে রোলেক্স ঘড়ি ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ, আবার অন্যদিকে কোটি টাকার চেক ডিজঅনার—সব মিলিয়ে এক জটিল আর্থিক প্রতারণার চিত্র স্পষ্ট।
উল্লেখ্য যে, সব অভিযোগ, মামলা, তদন্ত আর আদালতের আদেশ মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—
শফিউল্লাহ আল মুনিরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিস্তৃত সন্দেহের বলয়। তিনি কি শুধুই একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ী? নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও বড় কোনো প্রতারণার নেটওয়ার্ক? উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আদালত ও চলমান তদন্তের ওপর—কিন্তু প্রশ্নের আগুন ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
এসব অভিযোগের বিষয়ে শফিউল্লাহ মুনির এর বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য বক্তব্য প্রকাশ করা খেলনা।
